About বাংলা গল্পের আলোয়

Manual Description Here: Ea eam labores imperdiet, apeirian democritum ei nam, doming neglegentur ad vis.

বুদ্ধিমানরা ব্যয় করে পরকালের জন্যই

 

হযরত মালেক ইবনে দিনার ও এক বিশ্বাসী যুবকের গল্প!

হযরত মালেক ইবনে দিনার রহঃ। একদিন তিনি কোথাও যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে দেখলেন, এক যুবক গভীর চিন্তায় নিমগ্ন। কী যেন ভাবছে সে।





যুবক ভাবছিল—আমার হাতে টাকা আছে। অনেক টাকা। যা দিয়ে অতি অনায়েসে একটি বিল্ডিং নির্মাণ করা যায়। আমি কি তাহলে বিল্ডিং নির্মাণের কাজে ব্যয় করব এ টাকাগুলো? হ্যাঁ বিল্ডিং নির্মাণের পিছনেই টাকাগুলো ব্যয় করা উচিত। কারণ এতে আমি দুনিয়ার জীবনে সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে পারব। তাছাড়া আমি যদি একটি বিল্ডিংয়ের মালিক হতে পারি, তবে সবাই আমাকে সমীহ করবে, শ্রদ্ধা করবে। আমার সাথে কথা

 বলতেও হিসেব করে কথা বলবে। সমাজের লোকদের কাছে আমি পাব এক অন্যরকম মর্যাদা।

হযরত মালেক ইবনে দিনার রহঃ কাশফের মাধ্যমে যুবকের ভাবনার বিষয়টি জেনে গেলেন। তাই তিনি যুবকটি কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, হে যুবক! কী ভাবছ তুমি?

যুবক বলল, আমি একটি বিল্ডিং তৈরি করার চিন্তা-ভাবনা করছি। বিল্ডিং তৈরির চিন্তা-ভাবনা?

হ্যাঁ।

তোমার বিল্ডিং নিশ্চয়ই ইট-সুরকি ও বালি দ্বারা নির্মিত হবে। হ্যাঁ, বিল্ডিং তো এসব জিনিস দ্বারাই তৈরি করতে হয়।

তা তো বটে! তবে আমি তোমার খেদমতে একটি কল্যাণকর প্রস্তাব রাখতে চাই। তুমি কি গ্রহণ করবে আমার প্রস্তাবটি? মেনে নিবে আমার কথা?

বলেই দেখুন না। ভালো প্রস্তাব হলে অবশ্যই গ্রহণ করব।

মালেক ইবনে দিনার রহঃ বললেন—তোমার পরিকল্পিত বিল্ডিংটি মাটির ইট দ্বারা তৈরি করতে যে পরিমান টাকা ব্যয় হবে, তুমি যদি আমাকে সেই পরিমান টাকা দিয়ে দাও, তাহলে আমি তোমার  জন্য এমন একটি বিল্ডিং তৈরি করে দেব যার একটি ইট হবে সোনার ও আরেকটি ইট হবে রুপার। আর আস্তর হবে মেশক ও জা’ফরানের।

কী বলো? তুমি কি এই প্রস্তাবে রাযী আছো?

যুবক বলল, খুব সুন্দর প্রস্তাব! তবে আমাকে একটু ভাবতে দিন।

ঠিক আছে। তুমি ভাবতে থাকো। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে আমাকে জানিও। এ বলে তিনি চলে গেলেন।

যুবক সারারাত চিন্তা করল। সিদ্ধান্ত নিল, স্বর্ণ-রৌপ্যের বিল্ডিং-ই সে বানাবে। কারণ ইট-সুরকি দ্বারা নির্মিত অস্থায়ী বিল্ডিংয়ের চেয়ে সোনা-রুপার তৈরি স্থায়ী বিল্ডিং অনেক শ্রেয়।

পরদিন সকালে হযরত মালেক বিন দিনার রহঃ যুবকের বাড়িতে উপস্থিত হলেন এবং তাঁর সিদ্ধান্তের কথা জানতে চাইলেন।

যুবক বলল, আমি স্বর্ণ-রুপার বিল্ডিংই চাই। ইটের তৈরি বিল্ডিং চাই না। আমি এখনই আপনার হাতে একটি বিল্ডিং তৈরির সম্পূর্ণ টাকা তুলে দিচ্ছি। তবে আপনার কাছে আমার আবেদন, আপনি আমাকে একটি কাগজে এ কথা লিখে দিন যে—

“যুবক তাঁর মৃত্যুর পর এই টাকার বিনিময়ে সোনা-রূপার তৈরি একটি বিল্ডিং পাবে।”

মালেক বিন দিনার রহঃ কাগজ কলম হাতে নিলেন। তারপর যুবক যা লিখার আবদার করেছিল, তা সুন্দর করে স্পষ্টক্ষরে লিখে দিলেন। অতঃপর সেখান থেকে এসে যুবকের অজান্তে তাঁর কাছ থেকে পাওয়া সবগুলো টাকা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে দিলেন।

মালেক বিন দিনার রহঃ এর বাড়ি ও ঘর!

কয়েকদিন পরের কথা। একদিন ঐ যুবক হযরত মালেক বিন দিনার রহঃ এর বাড়িতে গেল। দেখল, তাঁর বাড়িতে একটি কুঁড়েঘর ছাড়া আর কিছুই নেই। তাও আবার ভাঙ্গা।

যুবক জিজ্ঞেস করল, আপনি এই ঘর মেরামত করেন না কেন?

উত্তরে মালেক ইবনে দিনার রহঃ বললেন, আমার দুইটি বাড়ি আছে। একটি হলো যা তুমি দেখতে পাচ্ছ। অর্থাৎ এই কুঁড়েঘর। আর অপরটি হলো পরকালের ঘর। এখানে মাত্র অল্প কিছুদিন থাকতে  হবে। কাজেই এই অল্প দিনের জীবনের জন্য এতকিছু করে কোনো লাভ নেই। পক্ষান্তরে আখেরাত আমাকে চিরকাল থাকতে হবে। কাজেই আমি যা খরচ করি কিংবা জমা করি তা ঐ আখেরাতের ঘরের জন্য করি। দুনিয়ার এই অস্থায়ী বাড়ির জন্য কিছুই খরচ করি না। মনে রেখো, বুদ্ধিমান লোকেরা কিন্তু পরকালের বাড়ি নির্মাণের চিন্তাই সর্বদা করে থাকেন।

যুবকের দুনিয়া থেকে বিদায়কালের ঘটনা!

কিছুদিন পর যুবকটি মারা গেল। হযরত মালেক বিন দিনার রহঃ পুনরায় সেই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। যাওয়ার পথে যুবকের খোঁজ-খবর নিয়ে জানতে পারলেন, গত কয়েকদিন আগে যুবকটি দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে।

হযরত মালেক বিন দিনার রহঃ যুবকের আত্মীয়-স্বজনদের জিজ্ঞেস করলেন, এই যুবক মৃত্যুর আগে আপনাদের কিছু বলে গেছে কি?

একজন বলল, হ্যাঁ বলে গেছে। মারা যাওয়ার পূর্বে সে আমার হাতে একখন্ড কাগজ তুলে দিয়ে বলেছে, আমি যেন ঐ কাগজটি তাঁর কাফনের সাথে কবরে দিয়ে দেই। আমি তাঁর অসিয়ত পূর্ণ করেছি।

এ কথা শুনে হযরত মালেক বিন দিনার রহঃ মসজিদে প্রবেশ করলেন। হঠাৎ তাঁর নযর পড়ল মিম্বরের উপর ভাঁজ করে রাখা একটা কাগজের প্রতি। মনে হলো, এ কাগজটি যেন কোথাও তিনি দেখেছেন।

হযরত মালেক বিন দিনার রহঃ কাগজের টুকরোটি হাতে নিলেন। ভাঁজ খুললেন। দেখলেন, এটি ঐ কাগজ যা ইতোপূর্বে তিনি যুবকের হাতে দিয়েছিলেন। তিনি কাগজটি উল্টোলেন। দেখলেন, সেখানেও কিছু লিখা আছে। তিনি পড়লেন। সেখানে আছে—“হযরত মালেক বিন দিনার রহঃ আমাকে যে বিল্ডিং দেওয়ার  ওয়াদা করেছিলেন তা আমি পেয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ।”

প্রিয় পাঠক! যারা পরকালের জন্য খরচ করে তাদের সেই টাকা বৃথা যায় না। আলোচ্য ঘটনাটি এরই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাই আসুন, শুধু দুনিয়ার ঘর নয়, পরকালের ঘর তৈরির ব্যাপারেও সচেষ্ট হই। সেখানে কীভাবে আরামে থাকা যাবে, কীভাবে অফুরন্ত নেয়ামতের অধিকারী হওয়া যাবে, সেই চিন্তা করি, সেই ফিকির করি। পবিত্র কুরআনের আল্লাহ তায়ালা বলেছেন—তোমাদের কাছে যা আছে, তা শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু আল্লাহর কাছে যা আছে তা অবশিষ্ট থাকবে। অর্থাৎ দুনিয়াতে আমরা বাড়ি-গাড়ী, ধন-দৌলত যা-ই অর্জন করি না কেন, একদিন তা আমাদের হাতছাড়া হয়ে যাবেই। চাইলেও ছাতছাড়া হবে, না চাইলেও ছাতছাড়া হবে। কিন্তু যা আমরা আল্লাহর ব্যাংকে জমা করব, তা কোনোদিন হাতছাড়া হবে না। মৃত্যুর পর এর বিনিময় পুরোপুরিই আমরা পেয়ে যাব। যা আমরা ভোগ করতে পারব অনন্ত অসীম কাল। আর আল্লাহর ব্যাংকে জমা রাখার উপায় হলো—দীনের কাজে, ধর্মের কাজে টাকা-পয়সা খরচ করা। গরীব মিসকিন, ইয়াতিম-অসহায়কে দান করা। নিরন্ন, বুভুক্ষু মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসা। মসজিদ-মাদরাসা নির্মাণ ও উন্নয়নের কাজে অর্থ ব্যয় করা ইত্যাদি। হে আল্লাহ! তুমি আমাদের সবাইকে তোমার ব্যাংকে বেশি বেশি সঞ্চয় করার তাওফীক দাও। হিম্মত দাও। সাহস দাও। শক্তি দাও। আমিন। ইয়া রাব্বাল আলামীন।

লেখকঃ মাওলানা মুফীজুল ইসলাম

বইঃ আদর্শ যুবক যুবতি ১ (হৃদয় গলে সিরিজ) 

লেখকের আরও গল্প…

০১.

০২. 

০৩. 

০৪. 

০৫. 

Read More...

মদখোর প্রতিবেশি (বদলে যাওয়ার গল্প)




ইমামে আযম আবু হানিফা রহঃ। তাঁর ছিল এক মদখোর প্রতিবেশি। পেশায় ছিল মুচি। সারাদিন বাজারে জুতো সেলাই করত। সন্ধ্যায় উপার্জিত অর্থ দিয়ে মদ আর কাবাব কিনে বাড়ি ফিরত। বন্ধু-বান্ধবকে দাওয়াত দিয়ে আসর জমাত। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সবাই মিলে হৈ-হুল্লোড় করত।

মদখোর প্রতিবেশিটা ছিল বয়সে যুবক। নেশাগ্রস্থ হয়ে সে বারবার একটি কবিতা পাঠ করত। এই কবিতাটি সে এতো বেশি পাঠ করত যে, উপস্থিত লোকজন শুনে শুনে তা মুখস্থ করে ফেলতে সক্ষম হয়েছিল। কবিতাটির মর্ম হলো—

‘মানুষ আমাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। তারা এমন এক যুবককে ধ্বংস করেছে, যে যুদ্ধের কঠিন মুহূর্তে সীমান্ত হেফাজত করতে পারতো।’

ইমাম আবু হানিফা রহঃ তাকে অনেক বুঝিয়েছেন। সমঝিয়েছেন। মদ্যপানের অভ্যাস পরিত্যাজ্ঞ করতে বলেছেন। অনুরোধ করেছেন, রাত্রিকালে হৈচৈ না করতে। কিন্তু যুবক তাতে কর্ণপাত করেনি। ভ্রূক্ষেপ করেনি মোটেও। সে রয়ে যায় আগের মতোই।

যুবকের এই নিকৃষ্ট কর্মের জন্য এলাকার লোকজন অস্বস্থি বোধ করতে থাকে। এমনকি এক পর্যায়ে এই যুবককে তারা ঘৃণা করতে শুরু করে। সেই সাথে তাঁর উপর ক্ষিপ্ত হয়। রাগান্বিত হয়।

ইতোপূর্বে এলাকার লোকজনও তাকে এসব অন্যায়কর্ম থেকে বিরত থাকার জন্য বারণ করেছে বহুবার। বাধা দিয়েছে বারবার। কিন্তু এতেও কোনো কাজ হয়নি। অবশেষে নিরুপায় হয়ে তারা ঐ যুবকের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করে।

রাতে পুলিশ এল। তারা যুবককে গ্রেফতার করে কয়েদখানায় নিয়ে বন্দী করে রাখল।

সে রাতে ইমাম আবু হানিফা রহঃ শোরগোল শুনতে পেলেন না। তাই তিনি এই যুবক সম্পর্কে লোকদেরকে জিজ্ঞেস করলেন। বললেন, ঐ যুবকের বাড়ি আজ নীরব কেন? সে কি তাঁর বাড়িতে নেই?

লোকেরা বলল, এলাকার লোকজন তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেছে। তাই পুলিশ তাকে পাকড়াও করে জেল হাজতে পাঠিয়েছে।

মুচি যুবকের গ্রেফতারের সংবাদে হযরত ইমাম আবু হানিফা রহঃ দারুণ ব্যথিত হলেন। তিনি নিজের মর্যাদা ও পজিশনের দিক বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ না করে কয়েকজন সঙ্গীসহ আদালতে ছুটে গেলেন।

হযরত ইমাম আবু হানিফা রহঃ-এর আগমনে গোটা আদালত প্রাঙ্গনে সাড়া পড়ে গেল। মহামান্য হাকিম সাহেব স্বীয় এজলাস ছেড়ে নেমে এলেন। ইমাম সাহেবকে যথোপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন করলেন। তারপর বিস্ময়ভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন—হযরত! হঠাৎ করে আপনার আগমন? এ তো আপনার সম্পূর্ণ নীতি বিরোধী কাজ!

হযরত ইমাম আবু হানিফা রহঃ বললেন আমার এক প্রতিবেশি। পেশাউ মুচি। মদপানের অভিযোগে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেছে। পাঠিয়ে দিয়েছে কয়েদখানায়। আমি তা জন্যেই এসেছি। আপনি তাকে আমার জিম্মায় জামিন দিন। বাকিটা আমি দেখব। পরবর্তীতে সে এরূপ করলে আমি এর জন্য দায়ী থাকব।

হাকিম সাহেব কোনো আপত্তি করলেন না। সঙ্গে সঙ্গে মদখোর যুবকের জামিন মঞ্জুর করে দিলেন।

যুবক জেল থেকে বেরিয়ে এল। মুক্তির আনন্দে সে আত্মহারা। আবু হানিফা রহঃ তাঁর হাত ধরলেন। বললেন, কী ভাই! আমি তো তোমাকে ধ্বংস হতে দেই নি।

এ কথা দ্বারা হযরত ইমাম আবু হানিফা রহঃ যুবকের সেই প্রসিদ্ধ কবিতার প্রতি ইঙ্গিত করলেন।

যুবক মুচি এতক্ষণ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। সে যখন বুঝল, হযরত ইমাম আবু হানিফা রহঃ-এর দয়া, অনুকম্পা আর সুপারিশেই সে মুক্তি পেয়েছে, অথচ সে তাকে কত জ্বালাতন করেছে, তখন সে দারুণ প্রভাবান্বিত হলো এবং অত্যন্ত আদব ও নম্রতার সাথে বলল, হে আমার মনিব! আজকের পর আপনি আমাকে এমন কোনো কাজ করতে দেখবেন না। যাতে আপনি কষ্ট পান।

এরপর থেকে সত্যি সত্যি সেই যুবক হযরত ইমাম আবু হানিফা রহঃ এর দরসে উপস্থিত হতে লাগল। খোদার কী অপূর্ব মহিমা! হযরত ইমাম আবু হানিফা রহঃ-এর ওসিলায় একদিন সে কূফার বিশিষ্ট আলেমদের মধ্যে পরিগনিত হলো।

প্রিয় পাঠক! তাই আসুন, আমরাও মানুষের সাথে হযরত ইমাম আবু হানিফা রহঃ-এর ন্যায় চরিত্র মাধুরীর অনুপম দৃষ্টান্ত পেশ করি। পাপী-তাপী লোকদেরকে ঘৃণাভরে দূরে সরিয়ে না দিয়ে তাদেরকে ভালোবেসে আপন করার চেষ্টা করি। তাঁর সাথে উত্তম আচরণ করি। ত্যাগের সর্বোত্তম নমুনা পেশ করি। তাহলে একদিন দেখন, সেই মানুষগুলো তাদের যাবতীয় অপরাধ কার্য পরিত্যাগ করেছে। পরিচালনা করতে শুরু করেছে ইসলামী বিধান অনুযায়ী নিজের জীবনকে। সেই সাথে তারা পরিণত হয়েছে আমাদের অন্তরঙ্গ বন্ধুতে। আল্লাহ পাক আমাদের তাওফীক দান করুন। আমীন।

লেখকঃ মাওলানা মুহাম্মদ মুফীজুল ইসলাম

[সহায়তায়ঃ জীবনের পাতা থেকে, পৃষ্ঠাঃ ৪৫]

Read More...

বিয়ের গল্প : বুদ্ধির তেলেসমাতি

 বুদ্ধির তেলেসমাতি! লেখক এক যুবকের বিয়ের গল্প তুলে ধরেছেন যিনি উচ্চ দেন মোহরের জন্য তাঁর পছন্দের যুবতীকে বিয়ে করতে পারছিলেন না। অবশেষে সেই যুবক ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) পরামর্শে পছন্দের সেই যুবতীকে বিয়ে করতে সক্ষম হোন। ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)   সেই যুবককে কি পরামর্শ দিয়েছিলেন তা জানতে চলুন আমরা এই যুবকের বিয়ের গল্প টি পড়ি…

বুদ্ধির তেলেসমাতি-The marriage story of a young. 



টগবগে এক সুদর্শন যুবক। দেখতে যেমন সুন্দর, মনটিও তেমন সুন্দর। বাড়ি ইরাকের কুফা শহরে। ইমাম আবু হানিফা রহ. এর বাড়ির সঙ্গে। দু’বাড়ির মধ্যে মাত্র কয়েকশ গজ ব্যবধান।

যুবকের এখন বিয়ের বয়স। বিয়ের ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই তার। তাই সে বিয়ের কথা ভাবে। মনে মনে টুকটুকে সুন্দরি একখানা বউ খুঁজে। সেই সাথে কল্পনার পাখায় ভর করে ভবিষ্যৎ স্বপ্নের রঙিন আকাশে ঘুরে বেড়ায়।

খুঁজতে খুঁজতে যুবক পেয়ে যায় মনের মতো একটি বউ। যেমন তার রূপ, তেমন তার গুণ। এক কথায়–অপূর্ব। কিন্তু পেয়ে গেলেই তো হলো না! নিয়ম মাফিক প্রস্তাব পাঠাতে হবে। তারপর দু’দিকে কথা চালাচালি হবে। দেনমোহর ঠিক হবে। কনে দেখা হবে। খোদার ফযলে সবকিছু যদি ঠিকঠাক থাকে তবেই না বিয়ের পিঁড়ি!

প্রস্তাব দেওয়া হলো। কথা চালাচালি হলো। বেশ কয়েকদিন কেটে গেল। তারপর এল–দেনমোহরের কথা।

মেয়ের পিতা মোহর হাঁকলেন। পরিমাণ উল্লেখ করলেন। মোটা অঙ্কের মোহর। যা আদায় করা যুবকের পক্ষে শুধু কষ্টসাধ্যই নয়, অসম্ভবও বটে।

বিশাল অঙ্কের মোহরের কথা শুনে যুবকের মনে জ্বলে উঠা আশার প্রদীপটা দপ করে নিভে গেল। স্বপ্নের প্রাসাদ ভেঙ্গে চুরে খান খান হলো। মনটা ছেয়ে গেল নিরাশার আঁধারে। যুবক আর ভাবতে পারল না। ঠিক করতে পারল না, এখন তার করণীয় কি। তবে কি যুবকের ‘বউ প্রাপ্তির সুখ-স্বপ্ন’ পূরণ হবে না?

ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর মজলিশে প্রায়ই আসা-যাওয়া করত এই প্রতিবেশি যুবক। সেখানেই প্রচুর সময়ও দিত সে। তাই ইমাম সাহেবের সাথে হৃদ্যতার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল তার।

ইমামের পরামর্শে যুবকের বিয়ে করার গল্প

একদিনের ঘটনা…

বিরাট মজলিশ। মজলিশের প্রধান আকর্ষণ ও মধ্যমণী ইমাম আবু হানিফা রহ.। গোটা মজলিশের মধ্যে তার নূরাণী চেহারাটা যেন উজ্জ্বল আলো বিকিরণ করছিল। মজলিশ চলাকালে কত লোক আসে, কত লোক যায়। নিজেদের সমস্যার কথা বলে। পরামর্শ চায়। ইমাম সাহেব সবার কথা মনোযোগ সহকারে শুনেন। সবাইকে গুরুত্ব দেন। প্রাণখুলে কথা বলেন। পরামর্শ দেন।

একটু আগে মজলিশ শেষ হয়েছে। লোকজন চলে গেছে। এখন কোনো ভিড় নেই। কিন্তু যুবক এখনো যায়নি। এককোণে জড়সড়ো হয়ে বসে আছে। তার চেহারা বলছে-সে যেন কি বলবে, কিন্তু বলতে পারছে না। একরাশ সংকোচ তার গোটা অবয়বকে যেন চাদরের ন্যায় ঢেকে রেখেছে।

ইমাম সাহেবের দৃষ্টি হলো যুবকের উপর। চেনা মানুষ তো। তাই ডেকে একেবারে নিজের পাশটিতে বসালেন। জিজ্ঞেস করলেন–

-কেমন আছো তুমি?

-জ্বী হুজুর ভালো। যুবকের সংক্ষিপ্ত উত্তর।

-কিছু বলবে কি?

-জ্বী। একটু সমস্যা। তবে……।

-সংকোচের কিছু নেই। বলে ফেলো।

বিয়ের কথা। তা-ও আবার নিজের। সংকোচ তো লাগবেই। এটা শুধু ওর নয়, সবার বেলায়ই এমন হয়। অবশ্য আধুনিক কালের ফ্যাশনী যুবক-যুবতীদের কথা ভিন্ন। বিয়ে কেন, আরো কয়েক ধাপ অগ্রসর হতেও তাদের কোনো লজ্জাবোধ হয় না।

যুবক লজ্জাবিজড়িত কণ্ঠে কাচুমাচু করে বলল, হুজুর! আমি একটি মেয়েকে বিয়ের জন্য নির্বাচন করেছি। মেয়ের বাড়ি কুফা নগরীতেই। ইতোমধ্যে বিয়ের আলোচনা অনেকদূর পর্যন্ত গড়িয়েছে। কিন্তু এক জায়গায় গিয়ে সবকিছু থমকে দাঁড়িয়েছে। এখন কী যে করব কিছুই বুঝতে পারছি না।

এতটুকু বলে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল যুবক।

ইমাম সাহেব বললেন–থামলে কেন? বলো তোমার বিয়ের আলোচনা কোথায় গিয়ে, কেন থেমে গেছে।

যুবক বলল, হুজুর! দেনমোহর। এই দেনমোহরে গিয়েই বিলকুল থেমে গেছে আমার বিয়ের আলোচনা। কারণ মেয়ের বাবা এত বড় অঙ্কের মোহর দাবী করেছেন–যা আদায় করা আমার পক্ষে মোটেই সম্ভব নয়।

-তাহলে অন্যত্র মেয়ে দেখো।

-আমার মন যে এখানেই বসে গেছে হুজুর।

-তাহলে তো মুশকিল!

-মুশকিল বলেই তো আপনার কাছে এসেছি। বসে আছি আপনার পরামর্শের অপেক্ষায়। মেহেরবানী করে আপনি একটি পথ বলে দিন।

-ঠিক আছে। আগে তুমি ইস্তেখারা করো।

-ইস্তেখারা!

-হ্যাঁ, ইস্তেখারা করে আমাকে ফলাফল জানিও। ইস্তেখারা করার নিয়ম জানো তো?

-নিয়মটা বলে দিলে ভালো হয়। তাছাড়া ইস্তেখারা জিনিসটা কি তাও….।

-তাও জানো না এই তো?

-ঠিক তাই।

-ইস্তেখারা হলো, একটি বিশেষ ধরনের আমলের নাম। যে সব ভালো কাজ করার জন্য শরীয়তের পক্ষ থেকে তুমি সরাসরি আদিষ্ট নও–যেমন, বিদেশ গমন, স্ত্রী নির্বাচন ইত্যাদি–যেসব ভালো কাজ করার পূর্বে, তা তোমার জন্য কল্যাণকর হবে কি-না, উহা যাচাই করার জন্য যে বিশেষ আমল করা হয়–তা-ই ইস্তেখারা। এই আমলের নিয়ম–রাতে ঘুমানোর পূর্বে ইস্তেখারার নিয়তে দু’রাকাত নামাজ পড়বে এবং নামাজ শেষে একটি বিশেষ দোয়া পাঠ করবে। তারপর পবিত্র বিছানায় ঘুমাবে। ঘুম থেকে ওঠার পর তোমার মনটা যেদিকে স্থির হবে, সেটাই করবে। একদিনে মন স্থির না হলে পরপর কয়েকদিন করবে। ইস্তেখারা করলে, অনেক সময় স্বপ্নযোগে ভালো-মন্দ অবগত হওয়া যায়। তবে স্বপ্ন দেখা জরুরী নয়। এবার বুঝলে তো?

-জ্বী হুজুর বুঝেছি। এখন তাহলে যাই, ইস্তেখারা করে তারপর আসব।

-যাও।

যুবক চলে গেল। ইস্তেখারা করল। তারপর আবার এল ইমাম সাহেবের দরবারে।

ইমাম সাহেব দেখেই তাকে জিজ্ঞেস করলেন–

-কী খবর? ইস্তেখারা করেছ?

-জ্বী হুজুর করেছি।

-ফলাফল খুব ভালো।

-তাহলে ঐ মেয়েকেই বিয়ে করে নাও।

-মোহরের কী হবে হুজুর।

-ওরা যে পরিমাণ মোহর চায়, তা যে কোনো উপায়ে আদায় করে দাও। এরপর কি করতে হবে তা আমি দেখব।

-ঠিক আছে হুজুর তা-ই হবে।

এরপর বিয়ের তারিখ হলো। নির্ধারিত দিনে বিয়েও হলো। কিন্তু যুবক বেচারা অনেক চেষ্টা-তদবীর করেও মোহরের পূর্ণ টাকা সংগ্রহ করতে পারল না। তাই সে মেয়ে পক্ষকে বলল, এখন এই পরিমাণ মোহর নিন। বাকী টাকা কয়েকদিন পর পরিশোধ করে দিব।

মেয়ে পক্ষ কঠিন হৃদয়ের মানুষ। তারা বলল, মোহরের পূর্ণ টাকা আদায় না করা পর্যন্ত আমরা আমাদেরকে মেয়েকে বাসর ঘরে পাঠব না।

কী আশ্চর্য! সামান্য মোহরের কারণে যুবক তার প্রেয়সীর কাছে যেতে পারবে না!?

যুবক অস্থির, বেকারার। কিন্তু কী আর করা! বউ না দিলে তো জোর করে বউয়ের কাছে যাওয়া যায় না। অবশেষে কোনো উপায় না দেখে আবার সে হাজির হলো ইমাম সাহেবের দরবারে। তারপর বর্ণনা দিল সবকিছুর।

ইমাম সাহেব বললেন–নগদ ঋণ করে পুরো মোহর আদায় করে দাও। বউ আয়ত্তে আনো। তারপর তাদের এই কঠোরতার মজা তারাই বুঝবে।  

-সে কিভাবে হুজুর?

-সময় হোক বলব।

ঋণ করে পুরো মোহর আদায় করল যুবক। তারপর বাসর হলো। পরদিন বউ নিয়ে নিজ বাড়িতে চলে এল। ওর আনন্দ দেখে মনে হলো, যেন পুরো পুরো পৃথিবীটাই এখন তার ঘরে!

সুন্দরী বউ পেয়ে যুবককে বেশ কয়েকদিন বাইরে তেমন একটা দেখা গেল না। প্রায় মাসখানেক অতিবাহিত হওয়ার পর একদিন সে ইমাম সাহেবের খেদমতে উপস্থিত হল। বলল–

-হুজুর! বউ তো পেলাম। কিন্তু ঋণ শোধাব কী করে?

-ঋণ শোধানোর বুদ্ধি আছে না?

-কী সেই বুদ্ধি?

বুদ্ধিটা হলো, তুমি তোমার শ্বশর পক্ষকে বলো–‘জীবিকা উপার্জনের জন্য আমি দূরের সফরে যাব। বউকেও নিয়ে যাব আমার সঙ্গে।’ একথা বললে এরা তোমার উপর কোনো অভিযোগ তুলতে পারবে না। কেননা আইনত তোমার বউকে তুমি যেখানে যাও সেখানে নেওয়ার অধিকার রাখো। সফরে যাবার তৈরি নাও। তারপর দেখো কী হয়।

বুদ্ধি নিয়ে বেচারা ঘরে ফিরে এল। বুদ্ধির প্রয়োগ করল। শ্বশুর পক্ষকে বলল, উপার্জনের জন্য আমি খোরাসান যাচ্ছি। স্ত্রীও আমার সঙ্গে যাবে।

একথা শুনে তাদের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। বলল–কী? খোরাসান যাবে আমাদের মেয়েকে নিয়ে? বিশাল মরুপথ দিয়ে? পথে ডাকাতের ভয়!

এই মেয়েকে তারা সীমাহীন আদর করত। স্নেহ করত। সে ছিল সকলের নয়নের মনি। কলিজার টুকরো। সুতরাং পথের বিপদ-চিন্তা যতটা না তাদেরকে কষ্ট দিচ্ছিল, তার চেয়ে বেশি কষ্ট দিচ্ছিল, ওর বিচ্ছেদ-চিন্তা। তাদের থেকে ও দূরে চলে যাবে–এ ছিল তাদের নিকট বড় কষ্টের কারণ।

কিন্তু কি আর করা! স্বামী তার স্ত্রীকে কোথাও নিয়ে যেতে চাইলে তাকে তো আর বাধা দেওয়া যায় না।

অবশেষে তারা পরামর্শে বসল। আলোচনা করল। মেয়েকে আটকে রাখার কোনো পথ কিংবা কৌশল খুঁজে পাওয়া যায় কি-না, সে ব্যাপারে অনেক মাথা খাটাল। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলো না।

সবশেষে ঠিক হলো, আচ্ছা আমাদের মাথায় যখন কিছু আসছে না, আমরা একটা কাজ করি। বিষয়টি ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর নিকট উপস্থাপন করে তার কাছে পরামর্শ চাই। তিনি তো মস্তবড় জ্ঞানী লোক। তার ইলম অপরিসীম। তিনি একটা পথ বলে দিতে পারবেন নিশ্চয়ই।

সিদ্ধান্ত মোতাবেক সবাই হাজির হলো ইমাম সাহেবের খেদমতে। চোখে মুখে ভীষণ অস্থিরতা। সোনামুখ যেন শুকিয়ে শুটকি।

-কী হয়েছে আপনাদের? প্রশ্ন করলেন ইমাম সাহেব।

-ভীষণ বিপদ হুজুর!

-বলুন কী বিপদ আপনাদের।

তারা ধীরে ধীরে সবকিছুর বর্ণনা দিয়ে বিনয়ের সাথে বলল–এখন আমরা কি করব হুজুর? দয়া করে আমাদেরকে একটি পথ বাতলে দিন। আর যাই হোক মেয়ের বিচ্ছেদ আমরা কিছুতেই বরদাশত করতে পারব না।

ইমাম সাহেব বললেন–ইসলামী শরীয়ত স্বামীকে এই অধিকার দিয়েছে যে, সে সেখানে ইচ্ছা সেখানে তার স্ত্রীকে নিয়ে যেতে পারবে। এক্ষেত্রে বাধা দেওয়ার কোনো অধিকার আপনাদের নেই।

-জ্বী হুজুর। অধিকার তো নেই। কিন্তু মেয়েকে তো আমরা ছাড়তে পারছি না। ওর বিরহ-ব্যথা সইবার মতো শক্তি আমাদের নেই। ওকে ধরে রাখার মতো একটি পথ আপনি বের করে দিবেন–এজন্যেই তো আপনার খেদমতে আসা।

হ্যাঁ, পথ একটা আছে।

একথা শুনতেই তাদের মলিন চেহারাগুলো সজীব হয়ে ওঠল। বলল, পথটা কি? তাড়াতাড়ি বলে দিন হুজুর।

-পথটা তো খুব সহজ পথ। কিন্তু আমার ভয় হচ্ছে–আপনারা সেই পথে চলতে রাজী হবেন কি-না।

-কোনো ভয় নেই হুজুর। আপনি নিঃসঙ্কোচে বলুন। এই মেয়ের জন্য আমরা যে কোনো ধরনের কুরবানী দিতে প্রস্তুত।

-ছেলেকে সফরে না যাওয়ার ব্যাপারে রাজী করিয়ে নিন। আর রাজী করানোর সহজ পদ্ধতি হলো, আপনারা তার কাছ থেকে যা কিছু মোহর স্বরূপ গ্রহণ করেছেন, সব ফেরত দিন।

-ঠিক আছে হুজুর। আমরা তাই করব। তবু আমরা আমাদের মেয়েকে এত দূরের সফরে যেতে দেব না।

কথা মতো সমুদয় মোহর ফেরত দেওয়া হলো। ঐ অর্থ দিয়ে ঋণ শোধ করার পরও যুবকের হাতে অনেক টাকা রয়ে গেল। ইমাম সাহেবের বুদ্ধির জোরে ‘বউ এবং অর্থ’ দুটোই লাভ হলো। প্রিয় পাঠক! দেখলেন তো বুদ্ধির তেলেসমাতি! 

প্রিয় পাঠক-পাঠিকা, লেখকের বিয়ের গল্প টি পড়ে আপনার কাছে ভালো লাগলে লেখককে ধন্যবাদ দিতে ভুলবেন না। আপনাদের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা লেখককে আরও সুন্দর ও ভালো লেখনির জন্য উদ্দীপনা যোগায়। – 

লেখকঃ মাওলানা মুহাম্মদ মুফীজুল ইসলাম (আদর্শ স্বামী স্ত্রী ১) 

Read More...

আদর্শ স্বামী স্ত্রী ১ : দাম্পত্য জীবনের গল্প

 চাঁদের চেয়েও সুন্দর, লেখক এক দম্পতির রাতের ঘটনা গল্প আকারে তুলে ধরেছেন। এক রাতে স্বামী স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে রাতে জ্যোৎস্না উপভোগ করছিলেন, মনের অজ্ঞতাবশে স্বামী স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়ে ফেলে। অতঃপর কি হলো? জানতে চলুন আমরা এই দম্পতির তিন তালাকের গল্প টি পড়ি…

চাঁদের চেয়েও সুন্দর! তিন তালাকের গল্প

“তুমি চাঁদের চেয়েও বেশি সুন্দরি।; যদি তুমি চাঁদের চেয়েও অধিক সুন্দরি না হও তাহলে তুমি তিন তালাক।





ঈসা ইবনে মূসা হাশেমী ছিলেন খলিফা মানসুরের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য গর্ভণর। এই গর্ভনরের স্ত্রী ছিল ভুবনমোহিনী রূপ-সৌন্দর্যের অধিকারী। আল্লাহ পাক যেন নিজ হাতেই তৈরি করেছিলেন এই রূপসীকে।

ঈসা হাশেমী তার স্ত্রীকে খুবই ভালোবাসতেন। আর অনিন্দ্য সুন্দরী স্ত্রী পেয়ে মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতেন।

একদা এক জোৎস্না রাতে স্ত্রীর সাথে খোশ-গল্প করছিলেন তিনি। এসময় তার চোখের সামনে দুটি সৌন্দর্য খেলা করছিল। একটি হলো চাঁদের অনুপম সৌন্দর্য আর আরেকটি হলো নজরকাড়া স্ত্রীর দৈহিক সৌন্দর্য। এই দুই সৌন্দর্য একত্রে অবলোকন করে তিনি অভিভূত হলেন। আপলুত হলেন। সেই সাথে তুলনা করে দেখলেন–চাঁদের সুন্দরের চেয়ে তার স্ত্রীই বেশি সুন্দরি। তাই তিনি স্ত্রীর প্রতি গভীর ভালোবাসা প্রকাশ ও তাকে খুশি করার উদ্দেশ্যে হাসতে হাসতে বললেন–“তুমি চাঁদের চেয়েও বেশি সুন্দরি।; যদি তুমি চাঁদের চেয়েও অধিক সুন্দরি না হও তাহলে তুমি তিন তালাক।

মানুষ অনেক সময় ঠাট্টাচ্ছলে কিংবা আনন্দের আতিশয্যে এমন কথা বলে ফেলে কিংবা এমন কাজ করে ফেলে, যার কারণে পরবর্তীতে তাকে নানাবিধ ঝামেলা পোহাতে হয়, পেরেশান হতে হয়, লজ্জা পেতে হয়, বিব্রতবোধ করতে হয়, এমনকি কোনো কোনো সময় এমন ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়, যা পূরণ করা ইহ-জনমেও আর সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই হাসি-তামাশার সময়ও নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং চিন্তা-ভাবনা করে কথাবার্তা বলা একান্ত প্রয়োজন।

তালাকের বিধান হলো, যে কোনোভাবে হোক–চাই ইচ্ছা করে হোক; চাই হাসি-ঠাট্টা করে হোক–স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাক দেয় তাহলে তা কার্যকর হবে। পরিস্কার “তালাক” শব্দ উচ্চারণ করে সেখানে একথা বলার সুযোগ থাকে না যে, আমি তো তালাক দেওয়ার নিয়তে বলিনি যে, আমি তোমাকে তালাক দিলাম। অনুরূপভাবে তালাক যদি শর্তযুক্ত হয় এবং উক্ত শর্ত পাওয়া যায়, তাতেও তালাক পতিত হয়ে যাবে। যেমন কেউ যদি তার স্ত্রীকে বলে, তুমি যদি আজ গোসল না করো, তাহলে তোমাকে তালাক। স্বামীর এরূপ বলার পর স্ত্রী যদি সেদিন গোসল না করে তাহলে তার উপর এক তালাকে রাজয়ী পতিত হবে।  অর্থাৎ এমতাবস্থায় স্ত্রীকে ইদ্দতের মধ্যে ফিরিয়ে আনতে পারবে। কিন্তু যদি শর্তযুক্ত তালাকের ক্ষেত্রে তিন তালাকের কথা উল্লেখ করে তাহলে শর্ত পাওয়া গেলে তিন তালাক পতিত হবে, তখন আর স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনতে পারবে না। [রদ্দুল মোখতার, দ্বিতীয় খণ্ড, ৬৮৭ পৃষ্ঠা।]

তালাকের বিধান এরূপ হওয়ার কারণে ঈসা ইবনে মূসার স্ত্রী স্বামীর সাথে আর একটি কথাও বলল না। সে উঠে সোজা পর্দার ভেতরে চলে গেল এবং বলল, আমি যদি সত্যিকার অর্থেই চাঁদের চেয়ে বেশি সুন্দরী না হই, তবে তো আমার উপর  তিন তালাক পতিত হয়ে গেছে। সুতরাং যতক্ষণ পর্যন্ত এ বিষয়টি স্পষ্ট না হবে যে, আমি চাঁদের চেয়ে বেশি সুন্দরি ততক্ষণ পর্যন্ত আমি আপনার সাথে পর্দা করেই চলতে থাকব।

স্ত্রীর কথা শুনে ঈসা ইবনে মূসার সম্বিত ফিরে এল। তিনি আফসোস করে বলতে লাগলেন, হায়! আনন্দের আতিশয্যে এ আমি কী বললাম! এখন আমার কী হবে? তবে কী আমার প্রিয়তমাকে আমি হারাতে যাচ্ছি? যদি তাই হয়, তবে কি হবে আমার অবস্থা! তাকে ছাড়া আমি বাঁচব কী করে? তার অনুপস্থিতিতে আমার জীবনের সচল চাকা তো একেবারে অচল হয়ে হয়ে পড়বে! এসব কথা ভাবতে ভাবতে গোটা রাত তার অস্থিরতা ও পেরেশানীর মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হলো।

পরদিন ভোর হতে না হতেই তিনি ছুটে গেলেন খলীফা মানসুরের কাছে। খুলে বললেন সব কিছু। খলীফা মানসুর বিষয়টির সুষ্ঠ সমাধানের জন্য তখনই শহরের বড় বড় ফকীহ ও মুফতিগণকে তলব করলেন। 

সবাই একত্রিত হয়ার পর আলোচনা শুরু হলো। অবশেষে সবাই একমত হয়ে ফতোয়া দিলেন–স্ত্রী তালাক হয়ে গেছে। কেননা চাঁদের চেয়ে অধিক সুন্দর হওয়া কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।

উলামায়ে কেরামের এ মোবারক মজলিশে উপস্থিত ছিলেন, ইমাম আবু হানিফা রহ. এর এক ছাত্র। তিনি চুপ করে বসে রইলেন। একটি কথাও বললেন না। খলীফা মানসুর তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি তো কোনো কথা বললেন না। চুপ হয়ে বসে আছেন। তবে কি উক্ত মাসআলায় আপনি ভিন্ন মত পোষণ করেন?

তিনি বললেন, উক্ত মাসআলায় আমি আপনাদের সাথে একমত নই। আমি মনে করি, স্ত্রী তালাক হয়নি। এ বলে প্রমাণস্বরূপ তিনি সূরা ত্বীনের একটি আয়াত তিলাওয়াত করলেন। যার অর্থ হলো–

“নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সবচেয়ে সুন্দর গঠনে সৃষ্টি করেছি।”

আয়াতের তিলাওয়াত শেষ করে তিনি খলীফা মানসুরের মুখপানে তাকালেন এবং বললেন–হে আমীরুল মুমেনীন! উক্ত আয়াত দ্বারা বুঝা যায় আল্লাহ পাক মানুষকে সুন্দরতম আকৃতিতে এবং চমৎকার গঠনে সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং আল্লাহ পাকের দৃষ্টিতে এবং পবিত্র কুরআনের আলোকে মানুষের চেয়ে সুন্দর আর কিছুই নেই, তাই ঈসা ইবনে মূসার স্ত্রীর চেয়ে চাঁদও সুন্দর নয়। অতএব তার উপর তালাক পতিত হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

তার এ বক্তব্য শ্রবণ করে উপস্থিত উলামায়ে কেরাম বিস্মিত হলেন এবং কোনোরূপ দ্বিমত পোষণ না করে তার ফতোয়া মেনে নিলেন।

এদিকে স্ত্রী তালাক না হওয়ার কথা শুনে ঈসা ইবনে মূসার আনন্দ দেখে কে! তিনি একরকম দৌড়েই বাসায় গেলেন এবং স্ত্রীকে একান্ত করে কাছে এনে সবকিছু খুলে বললেন। এমনতাবস্থায় তার স্ত্রীর আনন্দও কী পর্যায়ে পৌঁছেছিল তা কি আর বলার অপেক্ষা রাখে!?

প্রিয় পাঠক! যে কোনো অবস্থায় আমরা আমাদের মুখকে সংযত রাখব, হিসেব করে ভেবে-চিন্তে কথা বলবো–এ-ই হোক এ তালাকের ঘটনার মূল শিক্ষা। হে পাক পরওয়ারদিগার! তুমি আমাদের জবানকে হেফাযত করো। বুঝে-শুনে কথা বলার তাওফীক দাও। আমীন। [সহায়তায়ঃ প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠাঃ ৮৮]

প্রিয় পাঠক পাঠিকা, লেখকের তালাকের গল্প টি পড়ে যদি আপনার ভালো লেগে থাকে তাহলে এটি অবশ্যই আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। 

লেখকঃ মাওলানা মুহাম্মদ মুফীজুল ইসলাম (আদর্শ স্বামী স্ত্রী ১)

আরও জানুন:  যতো পারো কথা বলো (কসমের গল্প)


Read More...

কসম : যতো পারো কথা বলো (কসমের গল্প)

 যতো পারো কথা বলো, লেখক এক স্বামী স্ত্রীর কসমের ঘটনা গল্প আকারে তার বইতে তুলে ধরেছেন। স্বামী স্ত্রী ঝগড়ার এক পর্যায়ে একে অপরকে কসম দিয়ে বসে। অতঃপর ইমাম আবু হানিফা রহ নিকট শরাপন্ন হলে তিনি স্বামী স্ত্রীর এই কসমের ঘটনা মীমাংসা করে দেন। তাহলে চলুন স্বামী স্ত্রীর এই কসমের গল্প টি পড়া শুরু করি….

যতো পারো কথা বলো




দাম্পত্য জীবনকে সুখী, সমৃদ্ধ ও গতিশীল করার জন্য পরস্পর ঝগড়া-বিবাদ পরিহার করে চলা একান্ত অপরিহার্য। এ জীবনে কলহ-বিবাদ যত কম হবে, মনোমালিন্য যত হ্রাস পাবে ততই মঙ্গল, ততই শান্তি। এ জন্য জ্ঞানবান স্বামী-স্ত্রীর সর্বদাই এ থেকে দূরে থাকতে চেষ্টা করেন। অনেক সময় নিজে যথেষ্ট ছাড় দিয়ে হলেও ঝগড়া-বিবাদ এড়িয়ে চলেন। কিন্তু জ্ঞানহীন কিংবা কম আকলের লোকেরা অল্পতেই চটে যায়, রাগ করে এবং অবশেষে কলহে জড়িয়ে পড়ে। এমনকি অনেক সময় এমন কথাও বলে ফেলে, যার কারণে দাম্পত্য জীবনে এমন অচলাবস্থার সৃষ্টি হয় যা থেকে মুক্তি পাওয়া দুঙ্কর হয়ে পড়ে। আমি এ পর্যায়ে এ ধরনের একটি সত্য ঘটনাই সম্মানিত পাঠক-পাঠিকাদের উপহার দিতে চাই।

ইমাম আবু হানিফা রহঃ-এর জামানার ঘটনা। একবার এক লোক তার স্ত্রীর সাথে ঝগড়া করল। ঝগড়া যখন তুমুল পর্যায়ে চলে গেল তখন সে রাগের মাথায় কসম করে বলল, যতক্ষণ তুমি আমার সাথে কথা না বলবে, ততক্ষণ আমি তোমার সাথে কথা বলব না।

স্ত্রীর মেজাজও ছিল কড়া। এসময় তার উচিত ছিল, ঝগড়া আর আগে না বাড়িয়ে ধৈর্যধারণ করা এবং নিজের পক্ষ থেকে কথা বলে স্বামীকে কসম পুরা করার সুযোগ দেওয়া। কিন্তু যে স্ত্রীর মেজাজ গরম, সেই সাথে আবার আকলও কম–তার পক্ষে কি এরূপ করা সম্ভব!

স্বামীর কথা শেষ হতে না হতেই স্ত্রী আগুনের মতো জ্বলে ওঠল এবং স্বামীর ন্যায় কসম করে বলল, আপনি যতক্ষণ আমার সাথে কথা না বলবেন, আমি ততক্ষণ আপনার সাথে কথা বলবো না।

কসমের কী পরিণতি–রাগ বেশি হওয়ায় স্বামী-স্ত্রী কেউই বিষয়টি নিয়ে ভাবার সুযোগ পায়নি। কিন্তু পরে যখন হুঁশ ফিরে এলো এবং ক্রোধ প্রশমিত হলো, তখন তারা আফসোস করতে লাগল এবং এর সমাধানের জন্য এখানে সেখানে ছুটাছুটি করতে লাগল।

স্বামী বেচারা প্রথমে হযরত সুফিয়ান সাওরী রহঃ-এর শরণাপন্ন হলো এবং তার নিকট ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে সমাধান চাইল।

সুফিয়ান সাওরী রহঃ বললেন–স্বামী স্ত্রী যে-ই আগে কথা বলবে, তাকেই কসমের কাফফারা আদায় করতে হবে। কাফফারা আদায় ব্যতিত অন্য কোনো উপায় নেই।

হযরত সুফিয়ান সাওরীর ফতোয়ায় লোকটি একেবারে নিরাশ হয়ে গেল। তথাপি মাসআলাটির ব্যাপার নিশ্চিত হওয়ার জন্য ইমাম আবু হানিফা রহঃ এর খেদমতে উপস্থিত হলো।

ইমাম আবু হানিফা রহঃ লোকটির নিকট তার আগমনের কারণ জানতে চাইলে সে সব কিছুর বর্ণনা দিল এবং সবশেষে বলল, হযরত! আল্লাহর ওয়াস্তে আপনি একটু চিন্তা করে আমাকে একটা সমাধান বলে দিন।

ইমাম আবু হানিফা রহঃ বললেন–

যাও স্ত্রীর সাথে যত পারো মনভরে কথা বলো, কারো উপর কোনো কাফফার ওয়াজিব হবে না।

এ ফতোয়া শুনে সুফিয়ান সাওরী রহ. ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর খেদমতে হাজির হলেন এবং কীভাবে তিনি এই ফতোয়া দিলেন তার ব্যাখ্যা জানতে চাইলেন।

ইমাম আবু হানিফা রহ. বললেন–স্বামী কসম করার পর স্ত্রীও যখন কসম করল, তখন তো এই কসমের দ্বারাই তার কথা বলা হয়ে গেল। এখন যদি স্বামী আগে কথা বলে তাহলে সে যেমন কসম ভঙ্গকারী হবে না, তেমনি স্ত্রীও কসম ভঙ্গকারী হবে না। কেননা তখন তো স্ত্রীর আগেই স্বামীর কথা বলা হবে।

এ ব্যাখ্যা শুনে সুফিয়ান সাওরী রহ. বললেন–ইমাম আবু হানিফা উপস্থিত যে চিন্তা করেন, অন্যরা তার ধারে-কাছেও পৌঁছতে পারেনা। [সহায়তায়ঃ জীবনের পাতা থেকে।]

লেখকঃ মাওলানা মুহাম্মদ মুফীজুল ইসলাম (আদর্শ স্বামী স্ত্রী ১)

Read More...