About বাংলা গল্পের আলোয়

Manual Description Here: Ea eam labores imperdiet, apeirian democritum ei nam, doming neglegentur ad vis.

স্ত্রীকে ক্ষমা করার পুরস্কার

 হাকীমুল উম্মত হযরত থানবী (রহঃ) স্ত্রীকে ক্ষমা করে দেওয়ার পুরস্কার সংক্রান্ত একটি চমৎকার ও শিক্ষনীয় ঘটনা বর্ণনা করেছেন। আমার বিশ্বাস , এই একটি ঘটনা যদি প্রতিটি স্বামী তাদের হৃদয়ে সব সময় গেঁথে রাখেন তাহলে তাদের পক্ষে স্ত্রীর দোষ-ক্রটি দেখেও স্ত্রীকে ক্ষমা করা অনেক সহজ ও আছান হয়ে যাবে। তাহলে চলুন স্ত্রীকে ক্ষমা করে দেওয়ার মূল ঘটনাটি পড়ি…

স্ত্রীকে ক্ষমা করে দেওয়ার ঘটনা ও প্রতিদান

স্ত্রীকে ক্ষমা করার পুরস্কার




ঘটনাটি হলো, একদিন এক শ্রমিক বাজার থেকে একটি মুরগি খরিদ করল। সেই সাথে ঘি এবং অন্যান্য মসলা পাতিও কিনল। শ্রমিক লোকটি নিজের মেহনতের পয়সা এবং দেহের রক্ত পানি করে উপার্জিত পয়সা দিয়েই এসব কিনেছিল। তার মনে বড় আশা ছিল, আজ অনেক দিন পর হলেও একটু ভালো খাবার খেতে পারবে। কিন্তু তার আশা আর পুরা হলো না। কারণ মুরগী রান্না করার সময় অনিচ্ছাকৃত ভাবে স্ত্রীর হাত থেকে তরকারীর মধ্যে এত বেশি লবণ পড়ে গিয়েছিল যে, কোনোক্রমেই তা আর খাওয়ার যোগ্য রইল না।

শ্রমিক টি ছিল খুবই নম্র-ভদ্র। সেই সাথে আল্লাহ ওয়ালা। তাই সে খেতে বসে স্ত্রীকে কোনো কিছু না বলে, গাল মন্দ না করে শুধু পানি পান করে উঠে চলে গেলেন। সে মনে মনে বলে, আমার নিজের মেয়ের দ্বারা যদি এমন কোনো ঘটনা ঘটত, লবণ বেশী পড়ে যেত, তবে নিশ্চয় আমি কখনো এটা চাইতাম না যে, আমার জামাতা তাকে এই অপরাধের কারণে গাল মন্দ করুক, জুতা মারুক, অপমান-অপদস্থ করুক। তদ্রুপ আমার স্ত্রীও তো কারো মেয়ে।

এ পর্যন্ত ঘটনা বর্ণনা করার পর হযরত থানবী (রহঃ) বলেন- বন্ধুগণ! আমরা আমাদের মেয়েদের জন্য হুজুরের কাছে গিয়ে তাবীজ চাই যে, হুজুর! আমার জামাতা আমার মেয়ের সাথে খুব খারাপ আচরণ করে। তাই আমাকে এমন একটি তাবিজ দিন যার দ্বারা জামাতা আমার মেয়েকে মায়া-মুহাব্বতের সাথে রাখে, কোনো ভুল-ক্রটি হয়ে গেলে ক্ষমা করে দেয়। গালগালাজ না করে, মারধর না করে এবং সুখে-শান্তিতে রাখে।

বলুন! বন্ধুগণ! আমরা আমাদের মেয়েদের জন্য এরূপ তাবিজ নেই কিনা? যদি নিয়ে থাকি তাহলে বলুন তো, আমাদের যে স্ত্রী আছে তারা কি কারো মেয়ে নয়? নাকি তারা আকাশ থেকে পতিত হয়েছে। নাকি জমিন থেকে  উত্থিত হয়েছে? না, তারা আকাশ থেকে পতিত হয় নি, জমিন থেকে উত্থিত হয়নি। তারা বরং আমার মেয়ের মতোই অন্য কারো মেয়ে। অতএব, আমরা আমাদের মেয়েদের বেলায় যেমনটি ভাবি, যেমনটি চিন্তা করি, তাদের বেলায়ও তেমন চিন্তা করা উচিত। মনে রাখবেন, আমরা আমাদের মেয়েদের দুঃখ- দুর্দশা ও জামাতার দুর্ব্যবহারের কথা শুনে যেমন কষ্ট পাই, আমাদের মনে যেমন ব্যাথা লাগে ঠিক তদ্রুপ আমাদের স্ত্রীদের পিতাগণও নিজ নিজ মেয়ের দুঃখ- দুর্দশা ও জামাতার দুর্ব্যবহারের কথা শুনে সীমাহীন কষ্ট ও ব্যাথা পান। তাই স্ত্রীকে কষ্ট দেওয়ার পূর্বে একথাটি অন্তত একবার হলেও ভেবে নিন।

যাহোক, আবার মূল ঘটনায় ফিরে আসি। বলছিলাম, শ্রমিক লোকটি আপন মেয়ের কথা চিন্তা করে স্বীয় স্ত্রীর প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে তাকে একটি কথাও না বলে ক্ষমা করে দিল। সেই সাথে বলল, হে দয়াময় প্রভু! আমার স্ত্রী তো আপনারই  বান্দী। মাত্র কিছুদিনের জন্য তার ও আমার জিন্দেগী। কয়েকদিন পর, না আমি থাকব, না সে থাকবে। সবাই কবরের বাসিন্দা হয়ে যাব। আয় আল্লাহ! আপনার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আপনার বান্দী মনে করে তাকে আমি মাফ করে দিলাম।

এই ঘটনার বেশ কিছু দিন পর শ্রমিক লোকটি মারা গেল। মারা যাওয়ার পর একদিন জৈনিক বুজুর্গ তাকে স্বপ্ন যোগে দেখতে পেলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, ভাই ! আল্লাহ পাক তোমার সাথে কেমন ব্যবহার করলেন?

উত্তরে সে বলল, হুজুর! আমার তো অনেক বড় বড় গুনাহ ছিল। কিন্তু আল্লাহ পাক বললেন, একদিন তুমি আমার এক বান্দীর অপরাধ ক্ষমা করে দিয়েছিলে। এর বিনিময়ে আজ আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম।

আল্লাহ পাক পৃথিবীর সকল স্বামীকে এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে স্বীয় স্ত্রীর যাবতীয় দোষ – ক্রটি ও অপরাধ গুলোকে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখার তাওফীক দান করুণ। আমীন!!

লেখক : মাওলানা মুহাম্মদ মুফীজুল ইসলাম। 

Read More...

স্ত্রীর সাথে দুর্ব্যবহার! রাগে মাথা গরম হয়ে যায়

 আমাদের একশ্রেণী মুসলিম ভাইয়েরা আছেন যাহারা স্ত্রীর সাথে দুর্ব্যবহার, অকথ্যগালিগালাজ সহ স্ত্রীকে মারপিট করে শারীরিক ও মানসিকভাবে কষ্ট দিয়ে থাকেন। সেসব মুসলমান ভাইদেরকে জিজ্ঞাসা করা হলে তাহারা উত্তর দেন রাগে পাগল হয়ে যায় ফলে হুশ জ্ঞান থাকেন না। সেসব দাড়ি টুপিওয়ালা মুসলিম ভাইদের উদ্দেশ্যে লেখক তাঁর সুন্দরতম লেখনির মাধ্যমে কিছু উপদেশ ও পরামর্শ তুলে ধরেছেন। তাহলে চলুন স্ত্রীকে খুশি রাখতে লেখকের সোনালী উপদেশ টি পড়া শুরু করি…!

স্ত্রীর সাথে দুর্ব্যবহার করবেন না!

স্ত্রীর সাথে দুর্ব্যবহার! রাগে মাথা গরম হয়ে যায়


স্ত্রীর সাথে দুর্ব্যবহার করে দাড়ি টুপির প্রতি তাঁর ঘৃণাভাব সৃষ্টি করবেন না। স্ত্রীর প্রতি সদাচরণের ব্যাপারে অন্যদের তুলনায় দাড়ি ওয়ালা ও টুপি পড়নেওয়াদের অনেক বেশি যত্নবান হওয়া উচিত।

কেননা কোনো দাড়ি-টুপি ওয়ালা ব্যক্তি যার ইশারাক, আওয়াবিন ও তাহাজ্জুদও কাযা হয় না তিনি যখন স্বীয় স্ত্রীকে অহেতুক ধমক দেয়, মারধর এবং অন্যায় ভাবে তাকে কষ্ট দেয় তখন ঐ স্ত্রী মনে মনে ভাবে, আমার এই দাড়ি-টুপি ওয়ালা স্বামীর চেয়ে তো অনেক ভালো ঐ শার্ট-প্যান্ট ওয়ালাকে দেখতে পায় যে, সে তার স্ত্রীর সাথে সুন্দর, কত মধুর  ব্যবহার করছে তখন সে গভীর আক্ষেপের সাথে বলে, হায় আল্লাহ! স্বামী হিসেবে তো ঐ শার্ট-প্যান্ট লোকটিই উত্তম। হায়, কত ভালো হতো যদি আমি এই দাড়ি-টুপিওয়ালার পাল্লায় না পড়তাম!!

উপরের আলোচনা থেকে একথা পরিস্কার বুঝে আসছে যে, অনেক দাড়ি-টুপিওয়ালা স্বামী দুর্ব্যবহারের মাধ্যমে স্বীয় স্ত্রীদের অন্তরে দাড়ি-টুপির ব্যাপারে ঘৃণা সৃষ্টি করছে। যা আরেকটি স্বতন্ত্র মারাত্মক গোনাহ। তাই দাড়ি রাখার পর, নেক লোকদের বেশ ধারণ করার পর, ইশরাক-তাহাজ্জুদ আদায়ের পর, যিকির –অযীফা নিয়মিত আদায়ের পর এবং বুজুর্গদের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের পর স্ত্রীদের হকের ব্যাপারে যত্নবান হওয়ার দায়িত্বটি আমাদের উপর আরো কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

সুতরাং এমতাবস্থায় স্ত্রীদের সাথে আমাদের এমন ব্যবহার করা উচিত যাতে তাদের অন্তরে দ্বীনের প্রতি আগ্রহ ও অনুরাগ পয়দা হয়। তারা যেন মহল্লার বিবাহিতা মহিলাদের নিকট একথা বলতে বাধ্য হয় যে, আরে, কত ভালো হতো যদি তোমাদের বিয়ে কোনো আল্লাহওয়ালা দ্বীনদার ও বুজুর্গদের সাথে সম্পর্ক রাখে এমন কারো সাথে হতো। এবং মহল্লার অবিবাহিতা মেয়েদের যেন উৎসাহ দিয়ে বলে, আরে তোমরা কেন অফিসার ও স্মার্ট স্বামী তালাশ করছ, কেন উচ্চাভিলাষী ছেলের অপেক্ষায় রয়েছ, তোমাদের তো বরং জীবন সঙ্গী হিসেবে দ্বীনদার দাড়ি ওয়ালা নামাজী ছেলে কামনা করা উচিত। দেখ না, আমি দ্বীনদার স্বামী পেয়ে কেমন আরামে আছি! আমার স্বামী তো কোনো অফিসার কিংবা বড় কোনো পদে অধিষ্টিত নয়, নয় বিশাল অর্থবিত্তের মালিকও, কিন্তু দেখো আমাদের পরিবারে কত শান্তি! কত আরাম !!

কোনো ঝগড়া-ঝাটি নেই, মনোমালিন্য নেই, গালিগালাজ নেই, নেই কোনো অশান্তি ও যন্ত্রনা!! নেই কষ্ট ও বঞ্চনা।

রাগে পাগল হয়ে যাই- কথাটি ঠিক নয়!

অনেকে বলে – হুজুর! আমার রাগ খুব বেশী। রাগে আমি পাগল হয়ে যাই। বিবেক-বুদ্ধি হারিয়ে ফেলি। আর তখনই স্ত্রীর উপর জুলুম করে বসি। তাকে মারধর করি, মুখে যা আসে তা-ই বলি’।

আসলে তাদের একথাটা ঠিক নয়। এর প্রমাণ হলও- মনে করুণ, কোনো এক শক্তিশালী লোক মামুন নামক এক দুর্বল ব্যক্তির উপর রাগ করল এবং বলল, তুমি এক্ষুণি আমার সামনে থেকে সরে যাও। কারণ এখন আমার হুঁশ –জ্ঞান ঠিক নেই। ঠিক এই মুহূর্তেই যদি সেরের উপর সোয়া সের পড়ে অর্থাৎ তার চেয়ে আরো শক্তিশালী কোনো লোক তার মোকাবেলায় এসে দাঁড়ায় তখন  সে অধিক শক্তিশালী লোকটির সামনে হাত জোড় করে বলতে থাকে- সাহেব! দয়া করে আমাকে ক্ষমা করে দিন। আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি আর কখনো এমন করব না।

পাঠক! বলুন তো, লোকটি যদি সত্যিকার অর্থেই হুঁশ-জ্ঞান হারিয়ে ফেলত তাহলে কেন সে দ্বিতীয় লোকটির কাছে করজোড়ে ক্ষমা চাইছে।

সুতরাং বুঝা গেল, রাগে মানুষ হুঁশ-জ্ঞান হারায় না, পাগলও হয় না। যদি হতো তাহলে দুর্বল – সবল সবার সাথেই একই আচরণ করত। মোটকথা, নারী জাতি স্ত্রীরা সৃষ্টিগত ভাবে পুরুষের তুলনায় কম শক্তিশালী বলেই স্বামীরা তাদের উপর জুলুম করে এবং হুঁশ-জ্ঞান হারিয়ে ফেলার অজু হাত দেখিয়ে নিজকে বিচারের হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করে। যদি নারীরাও পুরুষের মতো শক্তিশালী হতো তাহলে কোনোদিন কোনো পুরুষ বলত না যে, আমি রাগে হুঁশ-জ্ঞান হারিয়ে স্ত্রীকে মারপিট করি।

রাগের চিকিৎসা

একবার জেদ্দা থেকে এক ব্যক্তি হযরত হাকীম আখতার সাহেব দামাত বারাকাতুহুম এর কাছে এই মর্মে চিঠি পাঠাল যে, হযরত! আমার ঘরে সর্বদা ঝগড়া-বিবাদ লেগেই থাকে। আর ঝগড়ার মূল কারণ হলো, রাগ। অর্থাৎ আমরা স্বামী-স্ত্রী, সন্তানাদি- সকলের মধ্যে রাগ খুব বেশী। যার ফলে কেউ কাউকে ছাড় দিতে চায় না। তাই কী কাজ করলে আমাদের রাগ কমবে তা বলে দিলে চিরদিন আমরা আপনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকব।

উত্তরে তিনি লিখলেন-রাগ কমানোর জন্য আপনাদেরকে নিম্নলিখিত (আমল ও দোয়া) কাজ গুলো করতে হবে।

১। খানা খাওয়ার সময় যখন দস্তরখান  বিছানো হয় এবং খানা সম্মুখে রাখা হয় তখন সাতবার বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম পড়ে খাদ্যের উপর দম করে তারপর খাবেন। বাচ্ছাদের খাবারের উপরও দম করে নিবেন।

অনুরূপ ভাবে খাবার তৈরী এবং রুটি বানানোর জন্য যে পানি ব্যবস্থার করা হয় তাতেও উল্লেখিত নিয়মে দম করুণ এবং ঐ পানির দ্বারা খানা পাকান ও খামীর বানিয়ে রুটি তৈরী করুণ। এতে ইনশা আল্লাহ ঘরের লোকদের মধ্যে মায়া-মুহাব্বত ও কোমল স্বভাব সৃষ্টি হবে।

২। চলতে – ফিরতে ইয়া আল্লাহ, ইয়া রাহমান, ইয়া রাহীম যথা সম্ভব বেশী বেশী করে পড়বেন।

৩। প্রতিদিন ঠাণ্ডা পানির সাথে একটি লেবুর রস, সামান্য গ্লুকোজ ও তিন চামচ ইসুবগুলের ভূষি মিশিয়ে তা পান করবেন।

প্রত্যহ এরূপ করলে রক্ত ও মেজাজ থেকে রুক্ষতা, কঠোরতা ও গরম ভাব চলে যাবে।

একমাস পর জেদ্দা থেকে হযরতের কাছে আরেকটি চিঠি এল। তাতে লেখা ছিল, হুজুর! আলহামদুলিল্লাহ্‌! আপনার কথা অনুযায়ী আমল করার পর আমার ঘরে এখন শান্তির সুবাতাস বইছে । সকলের মধ্যে কোমলতা ও মমত্ব দেখা দিয়েছে। ক্রোধ চলে গেছে। আমাদের সকলের মেজাজ এখন খুব নরম। সত্যি আল্লাহর নাম অনেক বরকতময়।

প্রিয় পাঠক পাঠিকা, আশা করি রাগ কমানোর আমল ও দোয়া গুলি আপনাদের ক্ষেত্রেও কাজে লাগবে। আমল করে দেখুন ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ পাক কবুল করবেন। 

লেখকঃ মাওলানা মুহাম্মদ মফীজুল ইসলাম (আদর্শ স্বামী স্ত্রী ২)

এরপর পড়ুন : স্ত্রীকে ক্ষমা করার পুরস্কার

Read More...

অঙ্গীকার পালনের বিরল দৃষ্টান্ত (শিক্ষণীয় গল্প)

 কারোর সাথে অঙ্গীকার করলে সেই অঙ্গীকার কিভাবে রক্ষা করতে হয় তাঁর একটি উপমা হবে এই গল্পটি। গল্পের লেখক খলিফা হারুনুর রশীদের শাসনামলের অঙ্গীকার পালনের একটি বিরল দৃষ্টান্ত গল্পাকারে তুলে ধরেছেন। তাহলে চলুন গল্পটি পড়া শুরু করি! 

অঙ্গীকার পালনের বিরল দৃষ্টান্ত (শিক্ষণীয় ইসলামিক গল্প)

অঙ্গীকার-পালনের-বিরল-দৃষ্টান্ত

প্রসিদ্ধ বাগদাদ নগরী। অসংখ্য স্মৃতি বিজড়িত এই বাগদাদ নগরীর এক কালের খলীফা ছিলেন বাদশাহ হারুন অর রশীদ। ঐশৰ্য্য, বৈভব, প্রাচুর্য, সৌন্দর্য্য এবং সুষমামন্ডিত বাগদাদ নগরী তারই আমলে একটি স্বপ্নপুরীতে পরিণত হয়েছিল । আব্দুল্লাহ ছিলেন তারই ঔরসজাত সন্তান ।

যিনি পরবর্তীতে মামুনুর রশীদ নামে ব্যাপক প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন । বাদশাহ হারুন অর রশীদের পরেই যিনি আমীরুল মুমিনীনের আসন অলংকৃত করেছিলেন।

মামুনুর রশীদ ছিলেন খলীফা হারুন অর রশীদের যোগ্য উত্তরসূরী। ন্যায়নিষ্ঠা, মহানুভবতা ও উদারতার জন্য তিনি সমধিক পরিচিত ছিলেন । তিনি প্রতি রমজান মাসে পবিত্র কুরআন শরীফ ৩৩ বার খতম করতেন। ধৰ্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে তার অসামান্য অবদান রয়েছে। ঐতিহাসিকগণ তার শাসনকালকে মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগ (Golden Age Of Islamic Civilization) বলে আখ্যায়িত করে থাকেন ।

৮১৯ খ্রীষ্টাব্দে যখন খলীফা মামুনুর রশীদ শাসনভার গ্রহণ করলেন । তখন তারই চাচা ইব্রাহীম ইবনে মাহদী তাঁর হাতে বাইআত গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান এবং বাগদাদে বিদ্রোহ শুরু করেন। তার বিদ্রোহ দমনের জন্য প্রগাঢ় প্রজ্ঞা, দৃঢ় সংকল্প, অপূর্ব বুদ্ধিমত্তা ও নির্ভীক চরিত্রের অধিকারী খলীফা মামুনুর রশীদ কালবিলম্ব না করে একটি শক্তিশালী বাহিনী প্রস্তুত করেন। এবং সমগ্র ইরাকে ঘোষণা করে দেন যে, যে ব্যক্তি আমার চাচা ইব্রাহীম ইবনে মাহদীকে গ্রেফতার করে দিতে পারবে তাকে একলক্ষ দিরহাম পুরস্কার দেয়া হবে।

এ সংবাদ শ্রবনে ইব্রাহীম ইবনে মাহদী অত্যন্ত ভয় পেলেন এবং নিজেকে বাঁচানোর জন্য আত্মগোপন করে অন্যত্র পালিয়ে গেলেন । কিন্তু সেখানেও তিনি বাঁচতে পারলেন না। বেশ কিছুদিন আত্মগোপন করে থাকার পর এক সময় তিনি সিপাহীদের হাতে বন্দী হয়ে খলীফার দরবারে অপরাধী হিসেবে উপস্থিত হলেন।

আত্মগোপনের সে দিনগুলো ইব্রাহীম ইবনে মাহদীর কিভাবে কাটলো, কিভাবে তিনি বন্দী হলেন, কিরূপ আচরণ করা হলো তার সাথে এবং এর পরবর্তী ঘটনাই বা কি ছিল এ নিয়েই এবারের চমকপ্রদ কাহিনী । চলুন, শিক্ষামূলক ও মর্মস্পশী সে কাহিনীটি তার নিজের মুখ থেকেই শুনি।

তিনি বলেন, যখন খলীফা মামুনুর রশীদ আমাকে বন্দী করার জন্য লক্ষ দিরহাম পুরস্কার ঘোষণা করলেন তখন আমি ভাবলাম, এ পরিস্থিতিতে বাগদাদে অবস্থান করা আমার জন্য মোটেও নিরাপদ নয় ৷

তাই আমি নিরুপায় হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লাম। তখন ছিল গরমের মৌসুম। দুপুরের খৈফোটা প্রচন্ড রৌদ্রের মধ্যে আমি উদ্ ভ্রান্তের মত হেঁটে চলছিলাম। বিরামহীন এই চলার কোন গন্তব্য আমার ছিল না। উদ্দেশ্যহীনভাবেই আমি একদিকে হাঁটছিলাম। এভাবে হাঁটতে হাঁটতে একসময় আমি একটি গলির মধ্যে ঢুকে পড়লাম।

গলির সরু পথ ধরে কিছুক্ষণ চললাম। হঠাৎ দেখি পথটি সামনের দিক থেকে সম্পূর্ণরূপে বন্ধ । সামনে এগুবার কোন রাস্তা নেই। পিছনে ফিরে যাওয়াও ভাল মনে করলাম না। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। ভাবনার সমুদ্রে হারিয়ে গেলাম আমি। মৃত্যুভয় চতুর্দিক থেকে ঘিরে ধরল আমাকে। মনে হল, এই বুঝি আমি ধরা পড়ে গেলাম।

আমি চিন্তা করছিলাম। হঠাৎ এক কৃষ্ণকায় যুবকের মায়াময় চেহারা আমার চিন্তায় ছেদ ফেললো। সে তার ঘরের দরজায় দাড়িয়ে । তাকে দেখে কেন যেন হৃদয়ে এক আশার সঞ্চার হল। আমি ধীর পদে যুবকের নিকট এগিয়ে গেলাম। বললাম, অত্যন্ত বিনয়ের সাথে-

ভাই! কিছু সময়ের জন্য আমাকে তোমার ঘরে আশ্রয় দিবে?

যুবক বললো, অবশ্যই দিব। আসুন, ভিতরে আসুন। একথা বলে সে আমাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও ভক্তির সাথে তার ঘরে নিয়ে গেলো এবং আমাকে একটি পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি কক্ষে বসাল।

আমাকে বসতে দিয়ে সে বলল, জনাব! আপনি একটু বসুন। আমি আসছি। বেশী দেরী হবে না ইনশাআল্লাহ। এ বলে সে চলে গেল ।

যুবক চলে যাওয়ার পর আমার মনে সন্দেহ জাগলো । ভাবলাম, যুবক আবার আমাকে ধরিয়ে দেয়ার জন্য পুলিশে খবর দিতে গেল না তো? একবার সিদ্ধান্ত নিলাম পালিয়ে যাব। কিন্তু তা আর হল না। ইতিমধ্যেই যুবক বিভিন্ন প্রকার সুস্বাদু খাবার নিয়ে উপস্থিত হয়ে বলল,

মুহতারাম! আমি একজন নাপিত। আমার ঘরের সাধারণ খাবার আপনাকে খাওয়ানো উচিত মনে করিনি। তাই আপনার জন্য বাজার থেকে সাধ্যমত ভাল খাবার নিয়ে এসেছি। অনুগ্রহ পূর্বক আমার মেহমানদারী কবুল করুন।

যুবকের ভদ্রতা ও উদারতা দেখে আমি সীমাহীন বিস্মিত হলাম। আমার প্রতি তার অপরিসীম শ্রদ্ধাবোধও আমাকে যারপর নাই আশ্চর্যান্বিত করল। শেষ পর্যন্ত তার উপস্থিত করা খাবার থেকে তৃপ্তি সহকারে খেয়ে নিলাম ।

খানা শেষ করার পরও অস্থিরতা ও পেরেশানীর ছাপ আমার চোখে- মুখে স্পষ্ট পরিলক্ষিত হচ্ছিল। এই অস্থির ভাব যুবকের সুতীক্ষ্ণ নজরকেও এড়াতে পারল না। আমার অস্থিরতায় যেন সেও অস্থির হয়ে উঠল । এ সময় কিছুক্ষণ চিন্তা করে হঠাৎ সে বলে উঠল, হুজুর! বেয়াদবী মাফ করবেন। আপনার সুললিত কন্ঠে কিছু কবিতা আবৃত্তি শুনতে পেলে নিজেকে ধন্য মনে করতাম ।

যুবকের কথা শুনে আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম। বিস্মিত কণ্ঠে বললাম, বাবা! আমি কবিতা জানি এ কথা কে তোমাকে বলল? কিভাবে তুমি এ কথা জানতে পারলে?

যুবক বলল, হযরত! আপনাকে চিনে না এমন দুর্ভাগা কে আছে? জীবনের একটি দীর্ঘ সময়তো আপনার স্নেহের ছায়াতেই কাটিয়েছি। আপনার ইব্রাহীম নামটি বাগদাদে কোন অপরিচিত নাম নয় । খলীফা মামুনুর রশীদ তো আপনাকে গ্রেফতার করার জন্যই এক লক্ষ দিরহামের পুরস্কার ঘোষণা করেছেন ।

যুবকের কথায় আমি আবারও বিস্মিত হলাম। অবশেষে জীবনের এই কঠিন মুহুর্তেও তার মন রক্ষার্থে কিছু কবিতা আবৃত্তি করে শুনালাম । সেও খুব আবেগ ও উচ্ছাসের সঙ্গে আমার কবিতা আবৃত্তি শ্রবণ করল । অতঃপর আমি বিদায় নেয়ার প্রস্তুতি নিলাম এবং তাকে কিছু উপহার দিতে চাইলাম । কিন্তু যুবক যথেষ্ট বিনয়ের সাথে তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করল এবং এ সংকটময় মুহূর্তে বাইরে না বেরিয়ে তার ঘরে আরো কিছুদিন থাকার অনুরোধ করল। আমিও তার কথা যুক্তিসংগত ভেবে আরও কয়েকদিন সেখানেই অবস্থান করলাম। যতদিন আমি তার ওখানে থাকলাম, ততদিন সে পূর্ণ আন্তরিকতা সহকারেই আমার মেহমানদারী ও আদর যত্ন করল। যতবারই আমি চলে যাওয়ার কথা বললাম ততবারই সে আমাকে একথা বলে যেতে বারণ করল যে, বাইরের পরিবেশ আপনার জন্য মোটেও নিরাপদ নয়। সুতরাং আপনি এখানেই অবস্থান করুন ।

বারবার একই কথা বলে যুবক তার উদারতা ও প্রশস্ত হৃদয়ের পরিচয় প্রদান করলেও একজন গরীব ছেলে আমার জন্য এত কষ্ট স্বীকার করবে তা আমার বরদাশত হচ্ছিল না। তাই একদিন তাকে কিছু না বলেই গোপনে সেখান থেকে অন্যত্র রওয়ানা হয়ে গেলাম ।

নিজকে আড়াল করার জন্য এ সময় আমি মহিলাদের পোষাক পরে নিয়েছিলাম। কিন্তু রাস্তায় বের হয়ে দেখলাম, একজন ঘোড় সওয়ার দাঁড়িয়ে আছে এবং সে তার সন্ধানী দৃষ্টি দিয়ে অত্যন্ত গভীরভাবে বারবার আমাকেই পর্যবেক্ষণ করছে। এক সময় সে যখন নিশ্চিত রূপে বুঝতে পারল যে, আমিই ইব্রাহীম ইবনে মাহদী তখন সে হঠাৎ ঘোড়ার পিঠ থেকে এক লাফে নেমে এসে আমাকে জাপটে ধরল। তারপর চিৎকার করে বলতে লাগল, ইব্রাহীম ইবনে মাহদী! ইব্রাহীম ইবনে মাহদী !! খলীফা যাকে গ্রেফতার করার জন্য লক্ষ দেরহাম পুরস্কার ঘোষণা করেছেন। তোমরা কে কোথায় আছ জলদী এসো।

আমি দেখলাম অবস্থা বেগতিক। অত্যন্ত শোচনীয়। তার কাছ থেকে ছুটতে না পারলে জীবন বাঁচাবার আর কোন উপায় নেই । তাই দেহের সমস্ত শক্তি একত্রিত করে তাকে এত জোরে একটি ধাক্কা লাগালাম যে, তা সামলাতে না পেরে সে ছিটকে গিয়ে একটি গভীর খাদের মধ্যে পড়ে গেল ৷

ঘোড়সওয়ার ছিল খলীফা মামুনুর রশীদের একজন শক্তিশালী সৈনিক। আমি তার সাথে এরূপ আচরণ করব এবং তাকে ধাক্কা দিয়ে খাদে ফেলে দিতে সক্ষম হব এমনটি হয়তো সে ভাবতেও পারেনি। খাদে পড়ে গিয়ে সে মারাত্মকভাবে আহত হয়। সেখানে পতিত হওয়ার পর সে আমাকে পাল্টা আক্রমণ করবে তো দূরের কথা, নিজেকে সেখান থেকে সাথে সাথে তুলে আনাও তার পক্ষে সম্ভব হল না। এ সুযোগে কালক্ষেপণ না করে আমি যে দিকে পারলাম উর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াতে লাগলাম এবং দ্রুত একটি সংকীর্ণ অন্ধকার গলির ভিতর ঢুকে পড়লাম ।

গলিপথ দিয়ে বেশকিছুক্ষণ চলার পর হঠাৎ দেখলাম, একজন মহিলা তার ঘরের দরজার সামনে বসে আছে। আমি খুব বিনয়ের সাথে তাকে অনুরোধ করে বললাম, বোন! আমার জীবন হুমকীর সম্মুখীন। দুশমনরা আমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। দয়া করে আমাকে একটু আশ্রয় দিন ।

সৎ স্বভাবের সে মহিলা আমার কথা শুনে সাথে সাথে আমাকে ঘরের ভিতর প্রবেশ করার আহবান জানাল এবং আমার প্রতি অনুগ্রহশীল হয়ে পর্দার আড়াল থেকে আমাকে লক্ষ করে বলল, জনাব! আসুন! ভিতরে আসুন!! আমি আপনাকে আশ্রয় দিচ্ছি। আমি আপনার নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করলাম ।

ঘরে বেশ কয়েকটি কক্ষ ছিল। মহিলার আহবানে আমি একটি কক্ষে প্রবেশ করার পর আমাকে সেখানে বিশ্রাম করার কথা বলে সে বাইরে দিয়ে কক্ষটি তালাবদ্ধ করে দিল। যাতে কেউ বুঝতে না পারে যে, এতে কোন লোক আছে। আমি মনে মনে আল্লাহর শোকর আদায় করলাম এবং একথা ভেবে স্বস্তি অনুভব করলাম যে, আর যাই হোক, খলীফা মামুনের সিপাহীর হাত থেকে তো বাঁচা গেল ।

কিন্তু পরক্ষণেই আমি যা শুনলাম ও দেখলাম, তাতে বেঁচে থাকার শেষ আশাটুকুও দপ করে নিভে গেল। কেননা কিছুক্ষণ পূর্বে যে সিপাহীকে খাদে ফেলে দিয়ে এখানে এসে আশ্রয় নিলাম সে-ই এখন আমার দরজার সামনে উপস্থিত। খাদে পড়ে গিয়ে সে মারাত্মক আঘাত পেয়েছে। যে মহিলা আমাকে আশ্রয় দিয়েছিল তার সাথে সে কথা বলছে। তার কাঁধে হাত দিয়েই সে বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করছে। তাদের কথা-বার্তা ও আচার-আচরণ দেখে আমার বুঝতে বাকী রইল না যে, উক্ত মহিলা সিপাহীর স্ত্রী ।

পায়ে আঘাত পাওয়ার কারণে সিপাহী খুঁড়ে খুঁড়ে মাটিতে পা হেঁচড়িয়ে চলছিল । মাথা ও দেহের বেশ কয়েকটি স্থান থেকে রক্ত ঝরতে দেখা গেল । মাঝে মধ্যে সে ব্যথায় ককিয়ে উঠছিল। ব্যাপারটা এখন এই দাঁড়াল যে, সিপাহীকে মারাত্মকভাবে আহত করে আমি তারই বাড়ীতে তারই প্রাণপ্রিয় স্ত্রীর আশ্রয় গ্রহণ করেছি। এ বিস্ময়কর অবস্থা প্রত্যক্ষ করে আমি হাসব না কাঁদব তা বুঝতে পারছিলাম না। এ সময় মনের ধুক ধুকানী আরও বেড়ে গেল। চারিদিক থেকে হীম-শীতল মৃত্যু আতংক আমাকে ঘিরে ধরল। এক সময় নিজের অজান্তেই অস্ফুট স্বরে বললাম, ইব্রাহীম! এবার তোমার বাঁচার আর কোন পথ নেই। তোমার মউতই তোমাকে এখানে ডেকে এনেছে।

আমার রুমের একটু দূরে বসে সিপাহী তার স্ত্রীর নিকট সম্পূর্ণ ঘটনা বর্ণনা করে শুনাল। আমার আকার আকৃতিও তার সামনে উপস্থাপন করল । আমার বয়স আনুমানিক কত হবে তাও সে বলতে ভুল করল না।

ফলে প্রিয়তম স্বামীর গোটা দেহকে রক্তাক্তকারী অপরাধী যে আমিই, একথা বুঝতে মহিলার মোটেও অসুবিধা হল না। এমতাবস্থায় মহিলা কি কঠিন সিদ্ধান্ত নিবেন তা বলাই বাহুল্য ।

কিন্তু ঘটনা দাঁড়াল সম্পূর্ণ উল্টো। পবিত্র মনের সে মহিলা শান্ত ভাবেই সবকিছু শুনে গেল। কিন্তু আমার কথা ঘুণাক্ষরেও সে স্বামীর সাথে উচ্চারণ করল না । এমন কোন আচরণও সে করল না যদ্বারা স্বামী বুঝতে পারে যে, আমি তারই ঘরে তালাবদ্ধ অবস্থায় বিশ্রাম করছি। আমি এখন তারই হাতের মুঠোয় ।

মহিলাটি একদিকে স্বামীর বর্ণিত কাহিনী মনযোগ সহকারে শুনে যাচ্ছে আর অন্যদিকে অত্যন্ত যত্নসহকারে আন্তরিকভাবে স্বামীর আহত স্থানগুলো পরিস্কার করে তাতে ঔষধ লাগিয়ে দিচ্ছে। মাঝে মধ্যে বিভিন্ন প্রকার কথা-বার্তা বলে স্বামীকে সান্তনা দিচ্ছে ।

এভাবে বেশ কিছুক্ষণ যাবত আন্তরিক সেবা-যত্ন, ভালবাসা, মহব্বত ও ভক্তিপূর্ণ আলাপ আলোচনায় স্বামীর শরীরে একটু আরামবোধ হলো এবং এক সময় সে গভীর নিদ্রায় নিমগ্ন হল।

এরপর যা ঘটলো তা ছিল আমার কল্পনারও অতীত। যা প্রত্যক্ষ করে আমি কেবল খুশিই হইনি রীতিমত বিস্মিতও হয়েছি। একজন মহিলা আপন কলিজার টুকরো স্বামীকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখেও কেবলই অঙ্গীকার পালনের জন্য অপরাধীকে এভাবে ক্ষমা করে দিতে পারে, তার সাথে এমন সৌজন্যমূলক ভদ্র ব্যবহার করতে পারে, উপরন্ত একলক্ষ দিরহামের পুরস্কারকে কোরবানী দিতে পারে তা আমার ধারণায় ছিল না। বিষয়টি আমার নিকট কেবল অসম্ভব নয় অবাস্তবও মনে হয়েছিল। কিন্তু মহিয়সী এ নারীর বেলায় তাই ঘটল। সে মহাপ্রলয়ের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত আগত সমগ্র মানব জাতিকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দিল মুসলমান ওয়াদা খেলাফ করতে পারে না। অঙ্গীকার রক্ষার জন্য যে কোন ধরণের কোরবানী দিতে সে প্রস্তুত থাকবে। নিজের সহায়-সম্পত্তি আর প্রিযতম স্বামী কেন, প্রয়োজনে স্বীয় জীবনকে বিপদের সম্মুখীন করে হলেও সে তার ওয়াদা রক্ষা করতে সচেষ্ট হবে। কেননা ওয়াদা পালন তো ঈমানেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওয়াদা খেলাফ সম্পর্কে কত কঠিন কথাই না উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেছেন ঐ ব্যক্তির ঈমান পূর্ণ নয়, যার ওয়াদা ঠিক নেই। তাই পরিপূর্ণ মুমিন হতে হলে অবশ্যই ওয়াদা পালনের প্রতি যত্নবান হতে হবে ।

যাহোক, স্বামীকে ঘুম পাড়িয়ে এ বিদূষী মহিলা হালকা পায়ে আমার দরজায় এসে দাঁড়ালো। তাকে আসতে দেখে আমি ভেবেছিলাম, এবার আর আমার রক্ষা নেই। কিন্তু বাস্তবে দেখলাম ভিন্ন কিছু। সে আমার কাছে এসে অত্যন্ত গাম্ভীর্যপূর্ণ ভাষায় অনুচ্চ স্বরে বলল, ভাই! এই সিপাহী যাকে আপনি মারাত্মভাবে জখম করেছেন তিনি আমার স্বামী । আর একজন দ্বীনদার স্ত্রী তার স্বামীকে কতটুকু শ্রদ্ধা করে, কি পরিমাণ মহব্বত করে তা হয়ত আপনার অজানা নয়। একে তো আপনি রাষ্ট্রদ্রোহীতার অপরাধে চরম অপরাধী আবার আমার কলিজার টুকরা স্বামীকে আহত করে সে অপরাধের মাত্রাকে আরও বহুগুণে বাড়িয়ে তুলেছেন। উপরন্ত আপনাকে এখন বন্দী করে খলীফার হাতে তুলে দিলে আমরা একলক্ষ দিরহাম পুরস্কার পেতে পারি এবং সেখানে আপনাকে অপমানিত হতে দেখে নিজেদের প্রতিশোধ স্পৃহাও চরিতার্থ করতে পারি । কিন্তু এতটুকু বলার পর তার গলা রুদ্ধ হয়ে আসে । মুখ থেকে কোন কথা সরে না। ছলছলিয়ে উঠে আখিযুগল। প্রিয়জনের এ কাহিনীর প্রতিক্রিয়ায় বড় দুফোটা তপ্ত অশ্রু মুক্তধারার ন্যায় নীচে গড়িয়ে পড়ে। স্বামীর রক্তাক্ত দেহের দিকে একবার তাকিয়ে সে দুহাত দিয়ে মুখ ঢেঁকে মাটিতে বসে পড়ে। ছোট্ট শিশুটির মতো মুখ গুজে কিছুক্ষণ কাঁদে। আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ে সে। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে আঁচলে চোখ মুছে সে আবার বলতে থাকে-

কিন্তু ভাইজান! আমি একজন মুসলিম নারী। আপনাকে আমি আশ্রয় দিয়েছি। নিরাপত্তা দেয়ার অঙ্গীকার করেছি। আপনি আমাকে বিশ্বাস করে আশ্বস্ত হয়েই আমার ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন। সুতরাং কিছুতেই আমি আপনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না। আমি আমার অঙ্গীকার পালনের জন্য যে কোন ধরণের কোরবানী দিতে প্রস্তুত আছি। আমার মানবতা ও ভদ্রতা কখনো এমনটি মেনে নিবে না যে, আমার আশ্রয়ে থাকাকালীন আপনার কোন কষ্ট হোক।

মহিলার কথা শুনে আমি লজ্জায় ও ভয়ে মাথা নীচু করে বসে রইলাম। আমার মুখ থেকে একটি শব্দও বেরোল না। মনে মনে বললাম, আল্লাহ! একি কোন মহিলা না ফিরিশতা? এমন অনুপম চরিত্র ও সুন্দর আদর্শের নারীও কি তাহলে পৃথিবীতে আছে? যারা কেবলই ওয়াদা রক্ষার খাতিরে এতবড় উদারতার পরিচয় দিতে পারে? লক্ষ্য দিরহামের মায়াকে অবলীলায় ধুলোর সাথে মিশিয়ে দিতে পারে? পারে আদরের স্বামীর প্রাণঘাতী শত্রুকে হাতের মুঠোয় পেয়ে এরূপ সৌজন্যমূলক কথা-বার্তা বলতে?

আমি কথাবার্তা না বলে, হতভম্বের মতো বসে রইলাম। মহিলার বলে যাওয়া কথাগুলো চিন্তা করতে লাগলাম। এভাবে চিন্তার অথৈ সাগরে হারিয়ে গেলাম । হঠাৎ মহিলাটি আবার কথা শুরু করলে আমি সম্বিত ফিরে পেয়ে তার কথার দিকে মনোনিবেশ করলাম।

সে বলল, ভাই! আমার স্বামী এখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। একটু পরেই হয়তো ঘুম থেকে জেগে উঠবেন। তাই দেরী না করে আপনি এখনই এখান থেকে অন্যত্র সরে যান। আমার স্বামী যদি জেগে উঠেন, তবে তা আপনার ও আমার উভয়ের জন্যই বিপদের কারণ হবে। সুতরাং আর এক মুহূর্তও বিলম্ব না করে আপনি চুপচাপ বেরিয়ে পড়ুন।

মহিলার কথা শেষ হওয়ার পর তাকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে কম্পমান পদে ধীরে ধীরে সেখান থেকে অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে আবারও বেরিয়ে পড়লাম । সেখান থেকে বের হওয়ার পর গোটা দুনিয়া আমার চোখের সামনে অন্ধকার হয়ে এল। মৃত্যু ভয়ে আমার আপাদমস্তক কাঁপতে শুরু করল। এ সংকটময় মুহূর্তেও আমি মহিলার মহানুভবতা ও তার অঙ্গীকার পালনের অনুপম দৃষ্টান্তের কথা বারবার স্মরণ করে সামনে অগ্রসর হতে থাকলাম ।

এভাবে কিছুদুর চলার পর হঠাৎ আমার এক প্রিয় বাদীর কথা মনে পড়ল । মনে মনে বললাম, আরে! এ বিপদ মুহূর্তে তো আমি তার কাছ থেকে সহায়তা নিতে পারি। এ কথা চিন্তা করে সাথে সাথে তার বাড়ীর দিকে রওয়ানা দিলাম। যখন আমি তার ঘরের দরজায় পৌছলাম তখন আমাকে দেখতে পেয়ে সে সাথে সাথে ঘর থেকে বেরিয়ে এল এবং খুব ব্যাকুল হয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল। কিন্তু তার এ কান্না যে মায়াকান্না ছিল, তা আমি বুঝতে পারিনি। অতঃপর সে আমাকে তার ঘরে নিয়ে গেল এবং আমার সাথে শান্তনামূলক অনেক কথাই বলল। আমার এ বিপদের কথা আলোচনা করে বার বার সে আঁচলে চোখ মুছল। এ অবস্থা প্রত্যক্ষ করে আমি আল্লাহ পাকের শোকর আদায় করলাম। ভাবলাম, জীবনের এই কঠিন মুহূর্তে কয়েকটা দিন হলেও তার নিকট নিশ্চিন্তে থাকা যাবে।

এরপরের ঘটনা সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য। একজন বাদী আপন মুনীবের সাথে এমন বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে তা আমি কল্পনাও করতে পারিনি । সে আমাকে ঘরে বসিয়ে কিছু সময়ের জন্য বাইরে বেরিয়ে গেল। আমি ভাবলাম, নিশ্চয়ই সে আমার জন্য খাবারের ব্যবস্থা করতে গেছে। এ সময় আমার পেটেও ছিল প্রচন্ড ক্ষুধা। তাই এ কথা ভেবে খুশি হলাম যে, এখন কিছু খাওয়া-দাওয়া করে কিছুক্ষণ আরাম করা যাবে। কিন্তু অল্পক্ষণের মধ্যেই আমার আশায় বালি পড়ল । আমি বাস্তবে যা দেখলাম, তা আমার কল্পনাকেও হার মানাল !

বাদী এবার ফিরে এল ৷ তবে একা নয়, কয়েকজন নওজোয়ান সিপাহীকে সঙ্গে নিয়ে। তার চোখে-মুখে প্রাণোচ্ছলতার ছাপ । সে এক গাল দুষ্টমীভরা হাসি দিয়ে বলল, এ দৃশ্য দেখে আপনি হয়তো আমাকে অকৃতজ্ঞ ভাবছেন। কিন্তু তাতে আমার কিছুই আসে যায় না। যদি আপনার মত শিকার ধরে দিতে পেরে লক্ষ দেরহাম পুরস্কার পাওয়া যায়, তাহলে একেই আমি জীবনের পরম পাওয়া বলে মনে করব। সুতরাং বন্দী হওয়ার জন্য প্রস্তুত হন।

বাদীর কথা শুনে ও এ অপ্রত্যাশিত দৃশ্য দেখে আমি সীমাহীন আশ্চর্য হলাম। আমি ঘাবড়ে গিয়ে বাদীকে লক্ষ্য করে শুধু এতটুকুই বললাম যে, উপকারীর উপকার বুঝি মানুষ এভাবেই করে। তুমি আমার প্রতি কেবল টাকার লোভে এতটা নিষ্ঠুর হতে পারবে তা আমি কোনদিন কল্পনা ও করতে পারিনি । একেই বলে ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ।

যা হোক এ অবস্থায়ই আমি বন্দী হলাম । সিপাহীরা আমাকে গ্রেফতার করে খলীফা মামুনের দরবারে উপস্থিত করল ।

খলীফার দরবারে পৌঁছে আমি রাজকীয় নিয়মানুসারে খলীফাকে সালাম করলাম । খলীফা আমার সালামের জবাব দিলেন বটে, কিন্তু রাগে- গোস্বায় তখন তিনি কটমট করছিলেন। গোটা দরবারে তখন একটা থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। কেউ কোন কথা বলছে না। রাষ্ট্রদ্রোহী, বিদ্রোহীর শাস্তি কত কঠিন ও নির্মম এবং তার শেষ পরিণতি কি হবে এখানকার সকলেই তা জানে। আর একথা আমারও অজানা ছিল না। বিভীষিকাময় মৃত্যু তখন আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছিল । আমি জানতাম, ন্যায়-পরায়ন এ খলীফার দরবারে স্বজনপ্রিয়তার কোন স্থান নেই। অপরাধী হিসেবে যে যতটুকু শাস্তির যোগ্য তা তাকে ভোগ করতেই হবে। তথাপি আমি জীবন রক্ষার শেষ চেষ্টা হিসেবে একটু সাহস সঞ্চয় করে বললাম-

আমীরুল মুমেনীন! দয়া করে আমার ব্যাপারে তাড়াগুড়া করবেন না । একথা নিঃসন্দেহে শতভাগ সত্য যে, একজন বিদ্রোহী হিসেবে আমি কঠোর শাস্তির যোগ্য। কিন্তু আপনার উদারচিত্ত ও দয়াভরা অন্তরের কাছ থেকে ক্ষমা লাভের ব্যাপারেও আমি নিরাশ নই ।

আমি জানি আমার অপরাধ অন্য সব অপরাধের চেয়ে বড়। কিন্তু আপনার বেনযীর উদারতা এবং হৃদয়ের প্রশস্ততা আমার অপরাধের চাইতেও বিশাল । আজ যদি আপনি আমাকে শাস্তি দিতে চান, তবে অবশ্যই আমি তার উপযুক্ত। আর আপনার সে অভিপ্রায়ে বাধা দানের ক্ষমতাও কারো নাই । কিন্তু আপনি যদি তা না করে আমাকে ক্ষমা করে দেন তবে তা আপনার মহানুভবতারই পরিচায়ক হবে এবং বিশ্বের ইতিহাসে আপনার নাম সোনালী অক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকবে। আমার কার্যাবলী যদিও ভদ্রতা পরিপন্থী ছিল, কিন্তু তাই বলে আমীরুল মুমিনীনের কাজও ভদ্রতা পরিপন্থী হবে এমন কল্পনা করাও আরেকটি অন্যায় বৈ কিছুই নয় ।

আমার কথাগুলো খলীফা গোগ্রাসে গিলছিল । মনে হল, প্রতিটি কথাই যেন তার হৃদয়ের গহীন কোণে মৃদু আঘাত করল। আর তারই প্রভাবে তার চেহারার রং পাল্টে গেল । বিরক্তি, বিষণ্নতা ও নিষ্ঠুরতার পরিবর্তে সে চেহারায় একটি মায়ার স্পষ্ট আবরণ ছেয়ে গেল। দারুন প্রভাবিত হয়ে পড়লেন তিনি ৷

এভাবে কিছুক্ষণ অতিবাহিত হওয়ার পর তিনি উপস্থিত সভাসদদের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন। তারপর বললেন,উপস্থিত পরিষদবর্গ! এ আসামীর ব্যাপারে আপনাদের অভিমত কি?

খলীফার প্রশ্ন শেষ হতে না হতেই তারা এক বাক্যে বলে উঠল, নির্মম মৃত্যুদন্ডই এ আসামীর উপযুক্ত শাস্তি। রাষ্ট্রদ্রোহীতার স্বাদ কত তিক্ত, নিষ্ঠুর মৃত্যুই তাকে উত্তমরূপে বুঝিয়ে দিবে।

কিন্তু দরবারে উপস্থিত উযীরে আজম আহমদ ইবনে খালেদ শুধু ভিন্ন মতামত পেশ করলেন। আল্লাহ তার মঙ্গল করুন। তিনি বললেন, আমীরুল মুমেনীন! বিদ্রোহী আসামীকে নিষ্ঠুর শাস্তি দিয়ে হত্যা করা একটি সচরাচর ব্যাপার। ইতিহাসে এটা কোন দুর্লভ বিষয় নয়। তবে আপনি যদি আপনার প্রশস্ত মন, অপরিসীম উদারতা ও বিশাল মহানুভবতার কথা স্মরণ করে তাকে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখেন তাহলে ইতিহাসের সোনালী পাতায় আপনার নাম চিরদিন অম্লান হয়ে থাকবে। অনাগত ভবিষ্যতের পরবর্তী প্রজন্ম আপনার নাম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।

খলীফা মামুন অত্যন্ত গুরুত্ব ও মনোযোগ সহকারে উযীরে আজমের কথাগুলো শ্রবণ করলেন। তারপর আমার প্রতি একটি অর্থপূর্ণ দৃষ্টি দিয়ে বললেন, আজ যদি বিদ্রোহী হওয়ার কারণে আমি আমার চাচার গায়ে তীর চালাই, তবে সেটা কার গায়ে লাগবে? সেটা তো প্রকারান্তরে আমার গায়েই লাগবে ।

আমীরুল মুমেনীনের কথা শুনে আমার শুষ্ক ঠোঁটে খেলে গেল এক টুকরো হাসি । খুশিতে ঝলকিত হয়ে উঠল আমার গোটা চেহারা। চোখের কোণে দেখা দিল বাধভাঙ্গা অশ্রু। তবে এ অশ্রু দুঃখের নয় আনন্দের। বেদনার নয় । খুশীর । মনে হল, এটিই যেন আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দের দিন। সবচেয়ে বড় খুশির দিন। তাই সীমাহীন আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েছিলাম আমি। অবশেষে নিজেকে সামলে নিয়ে আলহামদু লিল্লাহ বলে খোদার শোকর আদায় করলাম ।

এ সময় খলীফা মামুন আল্লাহ পাকের দরবারে সিজদাবনত হলেন এবং কিছুক্ষণ পর মাথা উত্তোলন করে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, চাচাজান! আপনি কি জানেন আমার সিজদার কারণ কি? আমি বললাম, আমীরুল মুমেনীন! এর কারণ হয়ত এটাই হবে যে, আল্লাহ পাক দয়া করে আমাকে আমীরের বাধ্যগত হওয়ার তাওফীক দান করেছেন।

খলীফা বললেন, না চাচাজান, আমি সিজদায়ে শোকর এজন্য আদায় করলাম যে, আল্লাহ পাক আমার ক্রোধের আগুন নিভিয়ে দিয়েছেন এবং আমাকে আপনার প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করার তৌফিক দিয়েছেন। একথা শুনে আমি আবারও খোদার দরবারে কালিমাতুস শুকর আদায় করলাম।

অতঃপর খলীফা মামুনুর রশীদ আসন থেকে নেমে আমার কাছে এসে বললেন, আত্মগোপনের দিনগুলো আপনার কিভাবে কোথায় কেটেছে তার কিছু বিবরণ আমাদেরকে শুনান। আমি সবাইকে পুরা বিবরণ শুনালাম । আমার বক্তব্য সকলেই মনোযোগ সহকারে শুনল এবং যারপর নাই আশ্চর্য হল। সবশেষে আমি বললাম, আজ আমার সকল অন্ধকার দূর হয়ে গেছে। আমার মনে আর কোন দুঃখ নেই। খলীফার আনুগত্য স্বীকার না করে সত্যিই আমি মহা ভুল করেছিলাম। আল্লাহ আমাকে সত্যের পথে ফিরে আসার তাওফীক দিয়েছেন। এখন আমি প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে পারছি। দিনের আলো-বাতাস উপভোগ করতে পারছি। এবার রাতের অন্ধকার দূর হয়ে আমার জীবনে এসেছে নব প্ৰভাত৷

আমার কথা শেষ হলে পর খলীফা ঐ যুবককে ডাকলেন, যে শ্রদ্ধাভরে সযত্নে আমার মেহমানদারী করেছিল। তারপর অঙ্গীকার পালনকারী ঐ মহিয়সী মহিলাকেও ডাকলেন যে নিজের অঙ্গীকার রক্ষার খাতিরে প্রেমাস্পদ স্বামীর প্রাণঘাতী শত্রুকেও নিঃসংকোচে ক্ষমা করে দিয়েছিল। অতঃপর ঐ ধোকাবাজ লোভী বাদীকে উপস্থিত করলেন, যে কয়েকটি দিরহামের লোভে আপন মুনীবের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে তাকে হত্যার জন্য খলীফার দরবারে পেশ করেছিল।

যে যুবক আমার মেহমানদারী করেছিল, খলীফা তার জন্য মাসিক একহাজার স্বর্ণমুদ্রা ধার্য করে দিলেন। আর ঐ নেককার দ্বীনদার মহিয়সী নারীকেও বিভিন্ন প্রকার পুরস্কার দিয়ে পরিতৃপ্ত করলেন ।

সবশেষে লোভী বাদীকে ডাকলে সে পুরস্কারের আশায় দৌড়ে এল। কিন্তু খলীফা তাকে পুরস্কারের পরিবর্তে মুনীবের সাথে বেঈমানীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিলেন।

আলোচ্য ঘটনায় একদিকে যেমন খলীফা মামুনের মহানুভবতার দিকটি স্পষ্টরূপে ফুটে উঠল ঠিক তেমনি অন্যদিকে একজন মুসলিম রমনীর ওয়াদা পালনের অভাবনীয় দৃষ্টান্তটিও আমাদের জন্য সবক হয়ে রইল। প্রকৃত প্রস্তাবে, মুসলমানদের চরিত্র তো এমনই হওয়া উচিত। আল্লাহপাক লেখক, পাঠক-পাঠিকা তথা বিশ্বের সকল মুসলমানকে এরূপ চরিত্র মাধুর্য দান করুন। আমীন। (সূত্র : বেহেশতী হুর)

লেখক: মাওলানা মুহাম্মদ মুফীজুল ইসলাম। লেখকের যে গল্পে অশ্রু ঝরে – হৃদয় গলে সিরিজ ৮ বই থেকে।

প্রিয় পাঠক-পাঠিকা, লেখকের বাংলার এক মহিয়সী নারী গল্পটি পড়ে যদি আপনার ভালো লাগে তাহলে অবশ্যই এটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন এবং আপনার মতামত জানাতে কমেন্ট করুন। 

Read More...

বাংলার এক মহিয়সী নারী (পতিপ্রাণা স্ত্রীর গল্প)

বাংলার এক মহিয়সী নারী, লেখক বাংলা এক পতিপ্রাণা নারীর জীবনের ছোট একটি ঘটনা গল্প আকারে তাঁর বইতে তুলে ধরেছেন। তাহলে চলুন আমরা এই মহিয়সী নারী’র গল্প টি পড়া শুরু করি…


আদর্শ স্বামী স্ত্রী ১  দাম্পত্য জীবনের গল্প

বাংলার এক মহিয়সী নারী! (জীবনের ঘটনা)





বর্তমানে অনেক মহিলাই এমন আছেন যারা দাবী করেন যে, “আমরা স্বামীর হুকুম ছাড়া কোথাও যাই না। স্বামীর খেদমত করি। স্বামীর কথামত চলি। স্বামীর মনে কষ্ট দিয়ে কোনো কথা বলি না। স্বামীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো কাজ করি না। যেভাবে চললে বা যে কথা বললে স্বামী খুশি হবেন, তা-ই করি।’

আমিও একথা বলি না যে, তাঁদের দাবী মোটেও সত্য নয়। হ্যাঁ, আমি বিশ্বাস করি—বর্তমান পৃথিবীতে এমন অনেক স্ত্রী-ই আছেন যারা সত্যিকার অর্থেই পতিপ্রাণা। যারা স্বামী ছাড়া আর কিছুই বুঝেন না। স্বামীর ছোট-বড় যে কোনো নির্দেশ পালনের জন্য এক পায়ে খাড়া থাকেন। যে কোনো মূল্যের বিনিময়ে হলেও সেই নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন। স্বামীর অনুমতি ব্যতীত কখনোই বাড়ির বাইরে পা রাখেন না।

বস্তুতঃ এসব মহিয়সী নারী জগতে আছেন বলেই আজো টিকে আছে এই পৃথিবী, আজো জন্ম নিচ্ছেন তাঁদের গর্ভে বড় বড় আলেম, গাউস কুতুব ও মনীষী। তবে একথা সত্য যে, কিছু কিছু স্ত্রী এমন আছেন, যারা অনুকুল পরিবেশ ও মন-মেজাজ ভালো থাকা অবস্থায় তো স্বামীর কথা মেনে চলেন, স্বামীকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা-ভক্তি করেন, সম্মান দেন, কিন্তু প্রতিকূল পরিবেশ কিংবা মন বিগড়ানো অবস্থায় স্বামীর কথা মোটেও মানেন না। শুধু তা-ই নয়, অনেক সময় তাঁরা মুখ দিয়ে এমন শক্ত কথাও বলে ফেলেন যা স্বামীর মর্যাদার সম্পূর্ণ পরিপন্থি; যা একজন স্বামী তার স্ত্রী থেকে কখনোই আশা করেন না। প্রকৃতপক্ষে যেসব নারী প্রথম প্রকারের অর্থাৎ যারা ভালো-মন্দ, খুশি-নাখোশ, অনুকূল-প্রতিকূল—এক কথায় সর্বাবস্থায় সকল পরিবেশে স্বামীর স্বামীর বড়ত্ব ও মহত্বকে হৃদয়ে ধারণ করে তার নির্দেশকে গুরুত্ব দিয়ে বিনা বাক্য ব্যয়ে পালন করেন, তারাই মূলতঃ আদর্শ স্ত্রী। তারাই জগতের গর্ব। তাঁদের দ্বারাই জগতের অশেষ কল্যাণ সাধিত হয়। তারাই লাভ করবে বেহেশতের সুউচ্চ মাকাম। পাঠকবৃন্দ! সর্বপ্রথম আমি এ ধরনের একজন আদর্শ স্ত্রীর শিক্ষণীয় ও সত্য একটি ঘটনাই আপনাদের শোনাব।

আজ থেকে প্রায় চব্বিশ পঁচিশ বছর আগের ঘটনা। একবার পটিয়া মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা হযরত মাওলানা হযরত মুফতি আজীজুল হক (রহঃ)-এর সুযোগ্য স্ত্রী তার বাপের বাড়িতে বেড়াতে যান। সেখানে যাওয়ার দু’তিন দিন পর থেকেই প্রবল বর্ষণ শুরু হয়। এই যে শুরু, আর শেষ হওয়ার নামগন্ধ নেই। একটানা চলছে তো চলছেই। এভাবে কয়েকদিন অবিরাম ভারী বর্ষণের ফলে বন্যা নেমে আসে। প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায় বাড়তে থাকে বন্যার পানি। এক পর্যায়ে বন্যার পানি বাড়ি-ঘরে ঢুকে পড়ে। ফলে কাঁচা ঘরগুলো ভেঙ্গে পড়তে শুরু করে। পানিতে ভেসে যায় হাজার হাজার একর ফসলের জমি। সহায়-সম্পত্তি আর জান বাঁচানোর তাগিদে মানুষের মাঝে শুরু হয় হাহাকার আর কলিজা ফাটা আর্তনাদ। এসময় অসহায় পানিবন্দী মানুষকে উদ্ধার করার জন্য বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন শত শত নৌকা নিয়ে আসে। এবং নারী-পুরুষ শিশুসহ মূল্যবান জিনিসপত্র সরিয়ে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে থাকে।

এদিকে হুজুরের স্ত্রীর বাপের ভিটাটিও ছিল মাটির তৈরি। পানি বেশি হওয়ায় অন্যান্য মাটির ঘরের ন্যায় এটিও ভেঙ্গে যায়। ঘরের ভিতরে হয়ে যায় কোমর পরিমাণ পানি। খাটের উপরও পানি চলে আসে। নিজেকে শুকনো রাখার মতো কোনো জায়গা আর বাকী নেই। এতক্ষণে শেষ হয়ে গেছে সকল প্রকার আশ্রয়। তাই বাড়ির লোকজন প্রাণের মায়ায় কাঁদতে শুরু করে। এমতাবস্থায় শহরের একটি নৌকা সেই পরিবারের সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসে।

উক্ত নৌকাটি বাড়িয়ে ঢোকার সাথে সাথে বাড়ির লোকজন তাতে উঠে পড়ে। কিন্তু হুজুরের স্ত্রী সেই নৌকায় উঠতে রাজী হলেন না। তাঁকে নৌকায় উঠা জন্য বারবার বলা হলো, অনেক বুঝানো হলো। কিন্তু তার একটিই কথা—আমার হুজুর (স্বামী) না এলে কিংবা আমাকে যাওয়ার জন্য কারো মাধ্যমে অনুমতি না পাঠালে কিছুতেই আমি এ বাড়ি ত্যাগ করব না। কারণ তার অনুমতি ছাড়া আমি কিছুই করি না। কোথাও যাই না।

এ সময় কয়েকজন মহিলা তাঁকে বলল, আপনি কি তাহলে এখানে থেকে মরবেন? জীবন দিবেন? জবাবে তিনি বললেন, হ্যাঁ, প্রয়োজনে  আমি মরতে রাজি আছি। প্রস্তুত আছি জীবন দিতে। তবু হুজুরের অনুমতি ব্যতীত আমি কোথাও যাব না। আমি যেমন তার অনুমতি নিয়ে বাপের বাড়ি এসেছি, তেমনি তার অনুমতি নিয়েই যেখানে যাওয়ার যাব। তবে আমার একান্ত বিশ্বাস যে, মুহতারাম হুজুর আমাকে নেওয়ার জন্য পটিয়া থেকে চলে আসবেন, অথবা অল্প সময়ের মধ্যেই কোনো নৌকা পাঠাবেন অথবা কারো মাধ্যমে আমার জন্য কোনো নির্দেশ প্রেরণ করবেন। যদি তিনি না এসে আমার জন্য কোনো নির্দেশ পাঠান তাহলে আমি সেই নির্দেশ মোতাবেকই কাজ করব। আমার জন্য আপনাদের বসে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই। মেহেরবানী করে আপনারা চলে যান। আল্লাহ পাক অতি শীঘ্রই আমার জন্য কোনো উত্তম ফয়সালা করবেন।

হুজুরের স্ত্রীর এই শক্ত মোনোভাব দেখে পরিবারের লোকজন অবশেষে অপারগ হয়ে তাঁকে রেখেই চলে যেতে বাধ্য হলেন। আর হুজুরের স্ত্রী একা একা আল্লাহর জিকিরে মশগুল হয়ে স্বামী কিংবা তার নির্দেশের অপেক্ষায় রইলেন।

এদিকে বন্যার পানি বেড়েই চলছে। সেই সাথে উপর থেকে পড়ছে টুপটুপ বৃষ্টি।

খানিক পর এই পতিপ্রাণা মহীয়সী নারীর জন্য আল্লাহর সাহায্য নেমে এল। আসলে যে নারী স্বামীর জন্য এরুপ নিবেদিত, স্বামীর ভক্তি-শ্রদ্ধা যার অন্তরে এর শক্তভাবে প্রোথিত, যে নারী স্বামীর নির্দেশ ছাড়া আজ পর্যন্ত নিজ বাড়ির বাইরে যাননি, সেই নারীকে মহান আল্লাহ পাক কি সাহায্য না করে পারেন? পারেন কি সেই নারীর আবেদন পূর্ণ না করে থাকতে?

দূর থেকে দেখা গেল, একটি নৌকা ধীরে ধীরে এদিকে আসছে। কাছে আসার পর দেখা গেল, এটি হলো ঐ নৌকা যা তার হুজুর অর্থাৎ হযরত মুফতি আজীজুল হক সাহেব (রহঃ) তাঁকে নিয়ে যাওয়ার জন্য পটিয়া থেকে পাঠিয়েছেন। তিনি সেই নৌকায় আরোহন করলেন এবং স্বামীর কাছে চলে গেলেন।

হুজুরের কাছে যাওয়ার পর হুজুর তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি তোমার পরিবারের লোকদের সাথে কেন আসলে না?

উত্তরে তিনি বললেন, আপনি কিভাবে ভাবলেন যে, আপনার অনুমতি ছাড়া আমি সেখান থেকে চলে আসব?

হুজুর বললেন—হ্যাঁ, আমি জানতাম, তুমি মরে গেলেও আমার অনুমতি ছাড়া সেখান থেকে কোথাও যাবে না। তাই আমি তাড়াতাড়ি করে তোমার জন্য নৌকা পাঠিয়ে দিয়েছি।

প্রিয় পাঠক-পাঠিকা! একটু লক্ষ্য করে দেখুন, এই মহিলা কতটা সতী-সাধ্বীও  পতিপ্রাণা নারী ছিলেন। যিনি জীবনের এমন ঝুকিপুর্ণ অবস্থায়ও স্বামীর হুকুমকে উপেক্ষা করে জীবন বাঁচাতে চাননি। বরং স্বামীর হুকুম না পেলে জীবনটাও বিলিয়ে দেওয়ার জন্য রাজী হয়ে গিয়েছিলেন। স্বামীর হুকুমের অপেক্ষায় কোমর পরিমাণ পানির নীচে একা নিরাশ্রয় হয়ে অবস্থান করেছেন। সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ পাক সকল স্ত্রীকে এরূপ পতিপ্রাণা স্ত্রী হওয়ার তাওফীক দান করুণ। আমীন।

[সহায়তায়ঃ পারভীন আক্তার, উত্তর আমীরবাদ, চট্টগ্রাম]

এরপর পড়ুন :

লেখকঃ মাওলানা মুহাম্মদ মুফীজুল ইসলাম

প্রিয় পাঠক-পাঠিকা, লেখকের বাংলার এক মহিয়সী নারী গল্পটি পড়ে যদি আপনার ভালো লাগে তাহলে অবশ্যই এটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন এবং আপনার মতামত জানাতে কমেন্ট করুন। 

Read More...

সর্বনাশা প্রেম (প্রেমের গল্প-কাহিনী)

 সর্বনাশা প্রেম একটি বাস্তব প্রেমের গল্প। 

এই বাস্তব প্রেমের গল্পের নায়কের নাম শুভ ও নায়িকা সায়েমা। গল্পের শেষে ঘটনার স্থান উল্লেখ করা হয়েছে। 


Bangla truth life story

গ্রামের ছেলে। নাম শুভ। গায়ের রঙ শ্যামলা। 
বয়স বাইশ-তেইশ হবে। মা-বাবার অতি আদরের সন্তান। 
     শুভর আর কোনো ভাই-বোন নেই।

ছাত্রজীবনে বেশ দুষ্ট ছিল শুভ। সেজন্য পড়ালেখায় বেশিদূর এগুতে পারে নি। কোনো রকম নবম শ্রেণী পাশ করেছে। মা-বাবা ওকে পড়ানোর জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছেন।

এলাকার পরিস্থিতি মোটেও ভালো নয়। খুব খারাপ। বখাটে ছেলেদের উৎপাত সীমার বাইরে। শুভ’র ভবিষ্যত নিয়ে ওর মা-বাবা খুব চিন্তিত। বড় উদ্বিগ্ন। পাড়ার ছেলেদের সাথে মিশে সে আবার নষ্ট হয়ে যায় কি না! কোনো অঘটন ঘটিয়ে বসে কি না!

শুভ’র বাবা একজন গার্মেন্টস সুপার ভাইজার। তিনি ভাবলেন, ছেলের পড়াশুনা যখন আর হবেই না, তখন ওকে আর বসিয়ে রেখে লাভ কি! কোনো একটা কাজ শিখুক ও। নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াতে শিখুক। তাহলে ভবিষ্যতে জীবিকা নির্বাহের জন্য ওকে আর তেমন কষ্ট করতে হবে না। তিনি আরো ভাবলেন, আমি যখন গার্মেন্টস-এ আছি, তাহলে ও গার্মেন্টসে-ই আসুক। ওখানকার কোনো একটি কাজ শিখুক। তাতে আমিও ওকে গাইড করতে পারব। দেখতে পারব ওর সুবিধা-অসুবিধা।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একদিন তিনি শুভকে নিয়ে গার্মেন্টস-এ গেলেন। সেই সাথে বুঝিয়ে দিলেন তাঁর কাজও। শুভ তাঁর বাবার কথামত কাজ শুরু করে দিল।

কাজে যোগদানের পর শুভ’র জীবনে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন আসে। অবশ্য এ পরিবর্তনের পিছনে গার্মেন্টস কিংবা সেখানকার কাজের কোনো কৃতিত্ব নেই। বরং কৃতিত্ব হলো, তাবলীগ জামাতের। এ কৃতিত্ব হলো, ঐ সব তাবলীগি ভাইদের যারা শুভকে অনেক বুঝিয়ে সমঝিয়ে ১০ দিনের জন্য জামাতে পাঠাতে সক্ষম হয়েছিলেন।

জামাত থেকে ফেরার পরই শুভর জীবনে পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগে। সে এখন রীতিমত নামাজ পড়ে। মাতা-পিতাকে শ্রদ্ধা করে। বড়দের মান্য করে। ছোটদের স্নেহ করে। আর সমবয়সীদের সাথে মৈত্রিত্ব তো আছেই। সেই সাথে তাদেরকে নামাজের দাওয়াতও দেয়। সময় পেলে কুরআন-হাদিস পড়ে। রাস্তা-ঘাটে যাকেই পায়, সালাম দেয়। বাড়িতে এলে মা-বাবাকে নামাজ পড়ার অনুরোধ জানায়। ফাযায়েল আমাল ও অন্যান্য ধর্মীয় কিতাবাদী পাঠ করে শোনায়।

শুভ’র এই পরিবর্তন স্পর্শ করে ওর বাবা-মাকেও। তাঁর চেষ্টা বৃথা যায়নি। কারণ যে মা-বাবা একসময় ধর্মীয় অনুশাসন পালনের ব্যাপারে যথেষ্ট উদাসীন ছিলেন, নামাজের ব্যাপারে যাদের কোনো গুরুত্ব ছিল না, এক ওয়াক্ত পড়লে তিন ওয়াক্তের কোনো খবর থাকত না; কখনো দুই তিন ওয়াক্তের নামাজ একত্রে পড়ে নিতেন, কখনো বা একেবারে ছেড়েই দিতেন—সে মা-বাবাই আজ নিয়মিত নামাজ আদায় করেন। কোনো অবস্থাতেই নামাজ কাযা হতে দেন না। ধর্মীয় বিধি-বিধান পালনের ব্যাপারেও তারা এখন যথেষ্ট অনুরাগী।

শুভ’র মধুর ব্যবহারে এলাকাবাসী মুগ্ধ হয়। এলাকার একটি অনন্য ও অসাধারণ ছেলে হিসেবে সকলের সুদৃষ্টি তাঁর প্রতি নিবন্ধ হয়। সবাই তাঁর প্রশংসা করে। বলে-এমন ছেলে এ যুগে পাওয়া খুবই কঠিন। সে কত নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর হুকুমের পাবন্দী করে। নবীজির তরীকা মত চলাফেরা করে। আসলে তাঁর সাথে অন্য কোনো ছেলের তুলনাই চলে না।

শুভ দাড়ি রেখেছে। খুব সুন্দর দাড়ি। এজন্য কিছু বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়স্বজন মশকারাও করে। বিভিন্নজন বিভিন্ন কথা বলে। এত বাধা-বিপত্তির পরও সে দাড়িতে হাত দেয়নি। কাটে নি। কামায়ও নি। কারণ সে জানে, দাড়ি রাখা ওয়াজিব। দাড়ি না রাখলে কবীরা গুনাহ হয়। যা তাওবা ছাড়া মাফ হয় না। দাড়ি কাটার অর্থ হচ্ছে নবীজীর কলিজায় আঘাত দেওয়া। আল্লাহ ও তদীয় রাসূলের নাফরমানী করা। তাঁর ভয় হয়, দাড়ি না থাকলে হাশরের ময়দানে যদি রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে না চিনেন! যদি আমার জন্য শাফায়াত না করেন, তাহলে আমার কী উপায় হবে? সেদিন কে আমার জন্য সুপারিশ করবেন?

শুভদের বাড়ি অবস্থা  বেশ স্বচ্ছল। তাদের সংসারে কোনো কিছুর অভাব নেই। সবাই স্বাচ্ছন্দে চলাফেরা করে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! হঠাৎ অযাচিত একটি অশুভ দৃষ্টি  শুভ-এর পিছু নেই। ঘায়েল করে শুভকে। বইয়ে দেশুভদের বাড়ি অবস্থা  বেশ স্বচ্ছল। তাদের সংসারে কোনো কিছুর অভাব নেই। সবাই স্বাচ্ছন্দে চলাফেরা করে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! হঠাৎ অযাচিত একটি অশুভ দৃষ্টি  শুভ-এর পিছু নেই। ঘায়েল করে শুভকে। বইয়ে দে তাঁর জীবনে মরু সাইমুম। উল্টিয়ে দেয় জীবনের সেই সোনালী পাতা। ঘুরিয়ে দেয় জীবনের মোড়। দিগভ্রান্ত করে দেয় ওকে। ঘটে যায় তাঁর জীবনে এক করুণ কাহিনী।

শুভর এক ঘনিষ্ট বন্ধু ছিল। একদিন সে তাঁর বন্ধুর সাথে ওদের বাড়িতে যায়।

হঠাৎ সে তাঁর সামনে দিয়ে একটি ষোড়শী মেয়েকে কোমর দুলিয়ে হেঁটে যেতে দেখে। মেয়েটি খুবই সুন্দরী। দৈহিক গঠন অসাধারণ। মায়াবী চাহনী। যে কেউ তাকে একবার দেখবে, সে তাকে পছন্দ করবেই।

শুভ মেয়েটিকে দেখে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। ভুলে যায় অতীতকে। পাল্টে যায় তাঁর মন-মগজ। মেয়েটির দিকে অপলক নেত্রে চেয়ে থাকে। মুহুর্তের মধ্যে সে কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যায়। ভাবতে থাকে, এত সুন্দরী মেয়ে! তাকে জীবনসঙ্গীনী বানাতে পারলে জীবনটা স্বার্থক হবে। হ্যাঁ, তাকে যে কোনো উপায়ে বধূ বানিয়ে ঘরে তুলতেই হবে।

শুভ’র চিন্তা-চেতনায় এখন শুধু সেই মেয়েটি। সারাক্ষণ কেবল একই ভাবনা। একই জল্পনা-কল্পনা। মেয়েটি কে? কী নাম তাঁর? কোথায় তাঁর বাড়ি? কী করে মেয়েটি? এসব জানার জন্য সে মরিয়া হয়ে উঠে। দ্রুত তাঁর খোঁজ-খবর নেয়। অবশেষে জানতে পারে, মেয়েটির নাম সায়েমা। তাঁর বন্ধুর ফুফাত বোন।

শুভ দুর্বল হয়ে পড়ে সায়েমার প্রতি। সে তাকে মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসতে শুরু করে। এখন তাঁর একটাই ভাবনা, যেমন করে হোক সায়েমার মন জয় করতেই হবে! বানাতে হবে—অর্ধাঙ্গিনী।

একদিন শুভ তাঁর বন্ধুকে নিয়ে সায়েমাদের বাড়িতে যায়। ওদের বাড়ি-ঘরও তাঁর বেশ পছন্দ হয়। এতে সায়েমার প্রতি তাঁর অনুরাগ-আকর্ষণ আরো বেড়ে যায়।

শুভ সায়েমার পিতা-মাতার সাথে নম্র ভাষায় কথা বলে। তাঁর ব্যবহারে তারাও মুগ্ধ হয়।

শুভদের নিয়ে সায়েমার বাবা জুমার নামাজ পড়তে যান। নামাজ শেষে একত্রেই বাড়ি ফিরেন। অতঃপর খানা-পিনা করেন ওদেরকে নিয়েই।

খানার পর্ব শেষে সায়েমার বাবা ঘর থেকে বেড়িয়ে যান। এ সুবাদে ক্ষণিকের মধ্যেই সায়েমার সাথে শুভর পরিচয় হয়। পরিচয় করিয়ে দেয় ওরই বন্ধুই। ওদেরকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে কী এক কাজের কথা বলে শুভর বন্ধুও বাইরে বেরিয়ে যায়। যাওয়ার সময় বলে যায়—তোমরা একটু কথা বলো, আমি কিছুক্ষণ পরেই ফিরে আসব।

এমন একটি সুযোগের অপেক্ষায় ছিল শুভ। এ সুযোগ পেয়ে তাঁর আনন্দ আর দেখে কে!

নির্জন কক্ষে শুভ আর সায়েমার মধ্যে অনেক আলাপ আলোচনা হয়। এক পর্যায়ে শুভ তাঁর মনের কথাটি ব্যক্ত করার সুযোগ পেয়ে যায়। তাই সে সুযোগটিকে হাতছাড়া না করে সায়েমার কাছে প্রেম নিবেদন করে বসে। বলে-সায়েমা! তোমাকে আমি জীবনের চাইতেও বেশি ভালোবাসি।

শুভর প্রস্তাবকে সায়েমা মনপ্রাণ দিয়ে গ্রহণ করে। তারপর উভয়ের মাঝে প্রেমালাপ শুরু হয়। সূচনা হয় একটি অবৈধ সম্পর্কের।

সায়েমা বড় লোকের মেয়ে। খুবই আধুনিকা। বৈধ-অবৈধতার তমীজ তাঁর মাঝে নেই। তাই তো সহজেই সে শুভ’র সাথে প্রেমে জড়িয়ে পড়ে।

প্রথমবারেই দীর্ঘ আলাপচারিতা চলে। চলে যায় অনেক সময়। এবার বাড়ি যাবার পালা। কিন্তু পাগল মন শুভকে সেখান থেকে আসতে দেয় না। মন চায় শুধু সেখানেই থাকতে। অনেক কষ্টে সেখান থেকে রওয়ানা দেয় সে। আসার সময় সায়েমা তাকে একটি ছবি এবং মোবাইল নাম্বার দিয়ে দেয়। আর বলে-মোবাইলে কিন্তু অবশ্যই যোগাযোগ রাখবে।

বাড়িতে আসার পর থেকে সায়েমার সাথে শুভ’র মোবাইলে কথাবার্তা শুরু হয়। রাত জেগেও সে কথা বলে। অনেক সময় খানা-পিনার কথাও স্মরণ থাকে না। সময়ে অসময়ে শুধু আলাপ আর আলাপ। এভাবে পার হয়ে যায় বেশ কয়েকটি মাস।

ছেলের এই আকস্মিক পরিবর্তন বাবার চোখকে ফাকি দিতে পারে নি। তিনি টের পেয়ে যান। জেনে ফেললেন সব কিছু। এসব কথা শুভ’র মাকে জানালে একদিন মা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কিরে বাবা! আমরা যা কিছু শুনছি তা কি সত্যি?

 শুভ’র সোজা উত্তর—হ্যা মা। সব সত্য।

বাবা! এম কাজ তোমার দ্বারা হবে, তা তো কখনোই আমরা ভাবতে পারি নি। যা হোক, যা করার তো করেই ফেলেছ, এবার এ ধংসাত্মক পথ থেকে ফিরে এসো।

না মা। এ পথ থেকে ফিরে আসা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না। ওকে ছাড়া আমি বাচব না। এই একটি মাত্র কাজ ছাড়া তোমরা আমাকে আর যা-ই বলো—আমি তা বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নিব। দ্বিতীয় একটি কথাও বলব না।

বাবা তুমি জানো না যে, বিবাহ-পূর্ব প্রেম-ভালোবাসা মানব জীবনে অকল্যাণ ডেকে আনে? সুস্থ মানুষকে অসুস্থ করে তোলে।  জ্ঞানবান মানুষ হয়ে যায় জ্ঞানহীন।

হ্যাঁ মা তা জানি। এ পথ যে কতটা বন্ধুর ও ভয়ঙ্কর তা আমার অজানা নয়। কিন্তু কী করব? আমি যে অপারগ। আমি যে মনকে কোনোভাবেই ফিরিয়ে আনতে পারছি না। তবে দোয়া করো মহান আল্লাহ পাক যেন আমাকে এ পথ থেকে ফিরিয়ে আনেন।

শুভর পিতার নাম আজমল হোসেন। রাতে তিনি বাসায় ফিরলে শুভর মা সবকিছু তাকে অবহিত করেন। তারপর বলেন—দেখুন, আমার যা মনে হয়, শুভকে এ পথ থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। তাই আমার পরামর্শ হলো, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওর বিয়ের ব্যবস্থা করুন। বিয়ে হয়ে গেলে সায়েমাকে সে ভুলে যাবে।

স্ত্রীর প্রস্তাবটি আজমল সাহেবের কাছে ভালই মনে হলো। তাই সেদিনই তিনি শুভর বিয়ের ব্যাপারে ঘটকের সাথে আলোচনা করলেন। ঘটক কয়েকটি মেয়ের খোঁজ দিলেন।

পরদিন শুভ জানতে পারে যে, বাবা তাকে অচিরেই অন্যত্র বিবাহ দিতে যাচ্ছেন। এ কথা শুনে ওর মাথা খারাপ হওয়ার অবস্থা। সে এখন কী করবে? কিছুই বুঝতে পারছে না।

শুভর দাদা এখনো বেঁচে আছেন। তিনি তাকে খুব স্নেহ করেন। আদর করেন। তাই সবশেষে অনন্যোপায় হয়ে দাদার কাছে সব খুলে বলল শুভ। বলল, দাদা! আব্বা যখন আমাকে বিয়ে দিতেই চাচ্ছেন, তো সে বিয়েটি যেন সায়েমার সাথেই হয়। এজন্য কিভাবে কী করতে  হবে তা আপনিই ভালো জানেন।

দাদা বললেন, তুমি কোনো চিন্তা করো না। দেখি কী করা যায়।

দাদা নাতির ইচ্ছাকে পূরণ করতে চাইলেন। তাই তিনি সায়েমার মামার কাছে প্রস্তাব রাখলেন। কিন্তু সায়েমার মামা সরাসরি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন। বললেন—সায়েমার সাথে শুভর বিয়ে—এ এক অসম্ভব কথা!

সেখান থেকে ব্যর্থ হয়ে শুভর দাদা আজমল হোসেনের সাথে এ ব্যাপারে আলাপ করলেন। অবশেষে উভয়ে পরামর্শ করে অন্যত্র পাত্রী দেখার সিদ্ধান্ত নিলেন।

ওদের সিদ্ধান্ত শুনে শুভর অবস্থা শোচনীয় আকার ধারণ করে। ভীষণ পেরেশান হয় সে। খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দেয়। রাতেও ঘুমাতে পারে না। এখানে সেখানে নানাজনের কাছে ধর্ণা দেয়। কিন্তু কোথাও ইতিবাচক সাড়া মিলে না। হঠাৎ শুভর মনে পড়ে, তাঁর এক প্রতিবেশি নানার কথা। যিনি সম্পর্কে সায়েমারও নানা হন। শুভ তাঁর কাছে যায়। তারপর সব্লকিছু খুলে বলে বহু অনুনয় বিনয় করে। সায়েমার বাবার সাথে আলাপ করে কাজ সমাধা করে দেওয়ার জন্য মিনতি জানায়। শুভর ব্যবহারে নানার কোমল মনটা গলে যায়। তাই তিনি তাকে আশ্বাস দেন। বলেন, যেভাবেই হঊক, আমি তোমার মননের আশা পূরণ করতে চেষ্টা করব।

সায়েমার নানা পরদিনই আজমল হোসেনের বাড়িতে আসেন। তারপর বহু কষ্টে মেয়ে ও মেয়ের জামাতাকে এই বিয়েতে রাযী করাতে সক্ষম হন।

কয়েক দিন পর সায়েমাদের বাড়ি থেকে কয়েকজন লোক শুভদের বাড়িতে যায়। এরও কয়েকদিন পর বরপক্ষ আসে সায়েমাদের বাড়িতে। খাওয়া দাওয়ার পর পাত্রীপক্ষের সাথে আলাপ-আলোচনা শেষে বিয়ের দিন-তারিখইও ঠিক করে। তারপর তারা বিদায় নিয়ে বাড়ির পথে রওয়ানা দেয়।

এদিকে মোবাইলের মাধ্যমে এ খবর জানতে পেরে শুভর আনন্দ আর ধরে না। সে কেবল অপেক্ষার প্রহর গুনতে থাকে। 

সায়েমাদের বাড়ি থেকে বেশকিছু পথ হেঁটে এসে বাসে চড়তে হয়। তাই তারা হাঁটতে লাগল। পথিমধ্যে বৃষ্টি শুরু হলে বরপক্ষের লোকজন একটি চা স্টলে বসে। সেখানে চা-ও পান করে। ইতিমধ্যে বৃষ্টি থেকে যায়। তারা স্টল থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নেয়। ঠিক এমন সময় হঠাৎ কোত্থেকে যেন তিনটি অভদ্র ছেলে সেখানে উপস্থিত হয়। তারা এসেই সবার সামনে সায়েমা সম্পর্কে অশ্লীল কথাবার্তা বলতে শুরু করে। ওদের একজন তো জঘন্য এক বাক্য উচ্চারণ করে। সে নির্লজ্জের মতো বলে—সায়েমার পেটে আমার চার মাসের বাচ্চা আছে!

এসব কথা বরপক্ষের লোকেরা মোটেও বিশ্বাস করে নি। তাদের ধারণা হলো, এ ছেলেগুলো সায়েমার সাথে শুভর বিয়ে ভেঙ্গে দেওয়ার জন্যই এসব কথা বলছে। হয়তো সায়েমা বা সায়েমাদের পরিবারের কারো সাথে ওদের শত্রুতা আছে। যার কারণে ওরা এসব আবোল-তাবোল প্রলাপ বকছে।

এদিকে ছেলেরা যখন দেখল, ওদের এ ঔষধ বরপক্ষের উপর তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করল না, তখন তারা আরো শক্তিশালী ঔষধ ব্যবহার করল। একজন বরপক্ষের সামনে সায়েমার কয়েকটি আপত্তিকর ছবি দেখাল।

হ্যাঁ, এবারের ঔষধটি বেশ কাজ দিল। এসব অশ্লীল ছবি দেখে ওরা বলতে লাগল, ছি! এমন খারাপ মেয়েকে আমরা বিয়ে করাতে চাচ্ছি। না, এ বিয়ে কিছুতেই হতে পারে না। এ বলে তারা বাড়িতে চলে এল।

যে তিনটি ছেলে স্টলে এসে সায়েমার ব্যাপারে খারাপ মন্তব্য করেছে ওদের একজনের সাথে সায়েমার আসলেই সম্পর্ক ছিল। সায়েমা দীর্ঘদিন যাবত ওর সাথে প্রেমখেলা খেলেছে। ঐ ছেলের পক্ষ থেকে বিয়েও প্রস্তাবও এসেছে। কিন্তু চেহারা ভাল না হওয়ার কেউ এ বিয়েতে রাজি হয়নি। ফলে শেষ পর্যন্ত ওর সাথে সায়েমার বিয়ে হয়নি। তখন থেকেই ছেলেটির আক্রোশ। সে পণ করে বসে যে, আমি বেঁচে থাকতে  দেখে নেব, সায়েমাকে তাঁর বাবা-মা কি করে বিবাহ দেয়! তাই কিছু যুবক ছেলে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে আজকের এই ঘটনা ঘটিয়েছে সে। যার ফলাফল শেষ পর্যন্ত এই দাঁড়িয়েছে যে, সায়েমার সাথে শুভর বিবাহও সম্পন্ন হয়নি।

এ ঘটনা বাতাসের গতিতে গোটা এলাকায় ছড়িয়ে পড়ল। সবাই এখন সায়েমাদের ঘৃণা করতে শুরু করল। তাদেরকে এখন আর কেউ সম্মান করে না। শুধু ছি ছি বলের নাক ছিটকায়।

হ্যাঁ, বহুদিন পরে হলেও সায়েমার আজ বুঝে এসেছে—আল্লাহর হুকুম পর্দার বিধান লঙ্ঘন করে অবৈধ প্রেমে জড়িয়ে পড়ার কারণেই তাঁর ও তাঁর পরিবারকে আজ লাঞ্চনা ও অবমাননার সম্মুখীন হতে হয়েছে। হারাতে হয়েছে সম্মান, সুনাম সবকিছু। সেই সাথে তাঁর ভবিষ্যত হয়ে পড়েছে নিকষ কালো অন্ধকার। তাঁর এ অবৈধ প্রেমের ফলে এক প্রেমিকের মনে জ্বলছে প্রতিশোধের আগুন, আর আরেক প্রেমিকের মনে জমা হয়েছে একরাশ ঘৃণা।

অতীতের অ্যালবাম প্রায়ই ভেসে ওঠে সায়েমার মনের ক্যানভাসে। যা দেখে এখন তাঁর নিজের মনেও ঘৃণা  জন্মায়। চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ে বাঁধভাঙ্গা অশ্রু। কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে বলতে থাকে—হায়, আমি কেন খোদার বিধান লঙ্ঘন করলাম। কেন পর্দার বিধানকে উপেক্ষা করে চললাম। যদি পর্দা করতাম তাহলে আমাকে কেউ দেখতে পেত না।  আমার প্রতি প্রেম নিবেদন করত না। আমার জীবনে কলংকের দাগ পড়ত না। আজ আমাকে এমন পরিস্থিতির শিকারও হতে হতো না। একজন সফল নারী হিসেবে বিবেচিত হতাম। উভয় জাহানে সুখের জিন্দেগী পেতাম। হায় আফসোস, হায় আমার নিয়তি!

 প্রিয় পাঠক-পাঠিকা! কী হলো অবৈধ প্রেমের শেষ ফলাফল? কী  দাঁড়াল এর পরিণতি! শোক, অনুতাপ আর সীমাহীন অনুশোচনা—সে তো এই নাজায়েয প্রেমের জন্যেওই! ওর মা-বাবা ও গোটা পরিবারের ইজ্জত আজ ভুলণ্ঠিত-সে তো এই অবৈধ প্রেমের কারণেই!!

তাই আসুন, আজ থেকে আমরা শরীয়তের বিধানাবলীকে শ্রদ্ধা করি। পর্দার বিধান মেনে চলি। অবৈধ প্রেমে জড়িয়ে নিজের দুনিয়া আখিরাত বরবাদ না করি। যারা এখনো অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত, আজ এবং এ মুহুর্তেই তা থেকে তাওবা করি। বেগানা নারী-পুরুষের প্রতি কেউ না তাকাই। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে এসব পাপকর্ম থেকে হেফাজত করুন। আমীন। 

বেপর্দা নারী তুমি করছ কত মজা!

মরার পড়ে পাবে তুমি অতি কঠিন সাজা।

ছেলেদের মন নিয়ে করছ কত খেলা

একদিন ভাঙ্গবে তোমার সকল রঙীন মেলা।

জীবনের যে সময়টুকু চলেছ ভুল পথে

তাওবা করে ফিরে এসো, চলো দীনের পথে।

[এটি নরসিংদী জেলার শিবপুর থানার একটি সত্য ঘটনা। পাঠিয়েছেন—মুহাম্মদ সোহেল মিয়া, শিবপুর, নরসিংদী]

আপনি পড়ছেনঃ আদর্শ যুবক যুবতি ১ বই থেকে। 

Read More...

যুবতীর কবলে যুবক (প্রেমের গল্প)


যুবতীর কবলে যুবক (প্রেমের গল্প)



রং নাম্বারে এক যুবতী মেয়ে’র সাথে পরিচিত হয় রাহাত। পরিচিত থেকে প্রেমে পরিণয়ে হয় তাদের সম্পর্কে। মোবাইলে চলতে থাকে তাদের প্রেমালাপন। রাহাত মনস্থির করে তার প্রেমিকাকে দেখার। বেঁছে নেয় একটি নির্জন পার্ক। তারপর…. 

গল্পঃ যুবতীর কবলে যুবক। 

লেখকঃ মাওলানা মুফীজুর ইসলাম। 

রাহাত। ইন্টার প্রথম বর্ষের ছাত্র। গত কয়েকদিন আগে কলেজে ভর্তি হয়েছে। আজ কোনো এক কারণে মনটা তাঁর ভালো নেই। খানিক আগে রুমের দরজা বন্ধ করে বিছানায় গেছে সে। তারপর ঘুমাবার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। কিন্তু ঘুম আসছে না। ঘুম যেন পালিয়ে গেছে শত মাইল দূরে। বালিশে মাথা রেখে শুধু এপাশ ওপাশ করছে রাহাত। স্বস্তি পাচ্ছে না কোনোভাবেই। এ মুহূর্তে কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধুই তাকে সান্ত্বনা দিতে পারে।

শরীফ রাহাতের অন্তরঙ্গ বন্ধু। সবচেয়ে কাছের বন্ধু। রাহাত ভাবল, ঘুম যখন আসছে না, তো মোবাইলে বন্ধু শরীফের সাথে একটু আলাপ করি। এরদ্বারা মনের গতিটা পরিবর্তন হতে পারে!

মোবাইল হাতে নিয়ে বাটন চাপতে থাকে রাহাত। তারপর সেন্ড বাটনে দিয়ে কল ঢুকায়। রিং হচ্ছে। কিন্তু রিসিভ হচ্ছে না। তাই মেজাজটা তারত আরো চটে যায়। মোবাইলটা ছুড়ে মারে অদূরের সোফায়।

বেশ কিছুক্ষণ পর মোবাইলটা তুলে এনে আবার চেষ্টা করল রাহাত। কিন্তু এবারও রিসিভ হচ্ছে না। তাই সে রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগল, বেটা ঘুমাচ্ছিস! রাত দশটায় ঘুম! ঘুমাবার আর সময় পেলি না!

তৃতীয়বারের মত আবারও চেষ্টা করল রাহাত। হ্যাঁ, এবার কল রিসিভ হয়েছে। মনে আশার সঞ্চার হয়েছে। বন্ধুর সাথে কথা বলবে! মনের কষ্ট লাঘব করবে। কিন্তু একি! এ তো শরীফের কণ্ঠ নয়। এ দেখছি মেয়েলী কণ্ঠ! কী ব্যাপার ওপাশ থেকে মেয়েলি কণ্ঠ ভেসে আসছে কেন? আমি তো এমনটি চাই নি।

রাহাত কী উত্তর দিবে! সে তো দীর্ঘক্ষণ বেদনার সাগরে ডুবেছিল। তীর খুঁজতে গিয়ে এ কিসের কবলে পড়ল সে!

মেয়েলী কন্ঠটা কেমন যেন বিষের মত পীড়া দিচ্ছে রাহাতকে। এই মুহূর্তে সে কোনো মেয়ের সাথে কথা বলতে প্রস্তুত নয়। তাই রাগের সাথে তৎক্ষণাৎ লাইনটা কেটে দিল।

পরক্ষণেই ভাবল, এরকম হলো কেন? দেখিতো নাম্বারে কোনো গোলমাল হয়েছে কি না? ওফ! ঘটনাতো সেখানেই। যাক, ভুল যখন হয়ে গেছে, কি আর করার!

রাহাত মোবাইল রেখে ঘুমাবার চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না। একটু পরেই মোবাইলটা বেজে উঠল। সে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল সেই মেয়েটিই কল ব্যাক করেছে। রাহাত রিসিভ করল না। লাইন কেটে দিল।

এভাবে কয়েকভার কেটে দেওয়ার পরও বারবার সেখান থেকে কল আসতে লাগল। অবশেষে রাগের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে যায় রাহাত। বন্ধ করে দেয় মোবাইল। নিশ্চিন্তে শুয়ে পড়ে বিছানায়।

পরের দিন রাহাত সব ঘটনা খুলে বলে শরীফকে। শরীফ বলল, দোস্ত! তুই মস্ত বড় ভুল করেছিস। মেয়েটির সাথে কিছু কথা বললেই পারতি। মেয়ে মানুষ কথা বললে আর কতটুকুই বা বলতে পারত। অল্পতেই ঠেকে যেত!

শরীফ ওসব কথা আর বলিস না। নাজায়েজ ও হারাম কাজে আমাকে পটাসনে। আমি ওসব বাজে  কাজে নেই।

পরিদন রাতে ঠিক সাড়ে বারটায় মেয়েটি আবার ফোন করল। রাহাত তাতে হালকা বিরক্তি বোধ করল। তবে আজকের অবস্থা গতকালের চেয়ে ভিন্ন। শরীরটা বেশ সুস্থ। মনটাও ভাল। সে ভাবল, দেখি মেয়েটা কী বলে?

রিসিভ করতেই মেয়েটি বেশ ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে উঠল, কে বলছেন? কে আপনি?

এভাবে দু’বার প্রশ্ন করার পর রাহাত অপরাধীর ন্যায় বলল, আপা! রাগ করেছেন? প্লীজ রাগ করবেন না। গতকালের ঘটনার জন্য আমি দুঃখিত। কল করার সময় মনটা ভীষণ খারাপ ছিল। তাই কোড নাম্বার ভুল হয়ে যাওয়ায় কলটা আপনার কাছে চলে গিয়েছে। শুধু শুধু আমাকে ভুল বুঝবেন না।

রাহাতের কথাগুলো জ্বলন্ত অঙ্গারে পানি ঢালার মত কাজ করল। নিমিষেই মেয়েটির কণ্ঠ বদলে গেল। কোমল হয়ে গেল কথার সুর। এরপর দু’জনের পরিচয় হলো। মত বিনিময় হলো। দীর্ঘসময় আলাপচারিতা হলো। এরই মাঝে একে অপরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে নিল। বেগানা মেয়েদের সাথে এভাবে কথাবার্তা বলা, ফ্রেন্ডশিপ করা যে অন্যায়, নাজায়েজ ও হারাম, রাহাত তা ভুলে গেল। পড়ে গেল শয়তানের ওয়াস ওয়াসায়।

বহুদিন যাবত চলতে থাকে তাদের এই সম্পর্ক। মোবাইল ফোনের ফ্রি কল অফার তাদের সুযোগ সুবিধাকে আরো বাড়িয়ে দেয়। রাত বারটার পর থেকে শুরু হয় প্রেমালাপ। কোনো কোনো সময় কথা বলতে বলতে রাত শেষ হয়ে যায় তবুও তাদের কথা শেষ হয় না। রাত যে শেষ হয়ে যাচ্ছে সেদিকেও তাদের খেয়াল থাকে না। এভাবেই তাদের মাঝে গড়ে উঠে এক অপবিত্র ও অবৈধ বন্ধন। প্রতি রাতেই মোবাইলে চলতে থাকে রাতভর দু’জনের প্রেমালাপ।

রাত জেগে জেগে রাহাতের স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে যাচ্ছে। সেই সাথে আক্রান্ত হয় বিভিন্ন প্রকার গোপন রোগে। ফলে সে এখন ভাল করে হাটতেও পারে না। চোখ দিটো গর্তের ভেতরে চলে গেছে। এসব দেখে একদিন ওর মা জিজ্ঞেস করলেন, রাহাত! তুমি দিনে দিনে এভাবে ভেঙ্গে পড়ছ কেন বাবা? এত রাত পর্যন্ত লেখাপড়া করার দরকার কি? স্বাস্থ্যের প্রতি লক্ষ্য রেখে পড়াশোনা করো। পরীক্ষার তো আরো কয়েকমাস বাকি। সহজ-সরল মা তাঁর স্নেহের সন্তানকে এ ছাড়া আর কী বলবেন!

রাহাত এ ব্যাপারে বন্ধু শরীফকে কিছুই জানায় নি। কে জানে, সে যদি আবার লজ্জা দিয়ে বসে যে, কিরে রাহাত! তুই না বলেছিস, এসব নাজায়িজ ও হারাম? ঐ পথে তুই যাবি না? এখন গেলি কী করে? তখন তাকে কী জবাব দেব!

দু’জনের কেউ কাউকে আজ পর্যন্ত দেখে নি। অথচ তাদের মাঝে দীর্ঘদিন যাবত বড় অভিনব পদ্ধতিতে চলছে অবৈধ সম্পর্ক, প্রেম-ভালবাসা। এ যেন নতুন যুগের নতুন কৌশল!

রাহাতের পরীক্ষার সময় ক্রমশ ঘনিয়ে আসছে। অথচ সেদিকে তাঁর ভ্রূক্ষেপ নেই। বরং আরো জঘন্য পথে পা বাড়াতে শুরু করে সে। ব্যাকুল হয়ে উঠে প্রেয়সীর প্রিয় মুখ দেখার জন্য।

রাহাত একদিন তাঁর মনের কথা মেয়েটির কাছে ব্যক্ত করে। বলে, দূর থেকে কথাবার্তা আমাদের মাঝে আর কতদিন চলবে? চলো না আমরা একদিন সামনাসামনি পরিচিত হই।

মেয়েটির নাম লাভলী। রাহাতের প্রস্তাব শুনে সে বলল, তোমার পরীক্ষা আগে শেষ হোক। তারপর এক মধুর ক্ষণে তোমার আমার সাক্ষাৎ হবে।

নির্ধারিত তারিখে পরীক্ষা শুরু হলো। কিন্তু রাহাত কী পরীক্ষা দেবে? সে তো পড়াশুনা করেনি বললেই চলে। রাতদিন কেবল ওর চিন্তায়ই সময় কাটিয়েছে। তাকে নিয়ে কল্পনার জাল বুনেছে। সুখ স্বপ্ন দেখেছে। তাঁর প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে লেখাপড়ার অবস্থা বারটা বাজিয়েছে।

পরীক্ষা শেষ হলো। কবে পরীক্ষা নামক মহা আপদটা শেষ হবে এ অপেক্ষায়ই ছিল রাহাত। কারণ পরীক্ষা শেষ না হলে তো লাভলীর সাথে সাক্ষাতের কোনো সুযোগ নেই!

পরীক্ষা শেষে রাহাত দীর্ঘ দিনের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। বহু প্রতীক্ষার সমাপ্তি ঘটিয়ে প্রেয়সীর সাক্ষাতের জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠল। রাহাতের আর তর সইছে না। একের পর এক কল দিতে লাগল লাভলীকে। কখন আসব? কোথায় থাকবে? তোমার সাক্ষাৎ কোথায় পাব? ইত্যাদি প্রশ্ন বারবার করতে থাকল।

সাক্ষাতের স্থান ও সময় ফোনেই নির্ধারিত হলো। স্থান নির্ধারণ হলো রমনা পার্কের নির্দিষ্ট এক জায়গায়। আজ তারা উভয়ে মহাখুশী। কারণ আজ তাদের বহু প্রতীক্ষিত—সাক্ষাৎ দিসব।

হঠাৎ রাহাতের মনে পড়ল বন্ধু শরীফের কথা। ভাবল, আজকের এই শুভক্ষণে বিষয়টিকে তাকে না জানালেই নয়। নয়তো বন্ধুর সাথে বড় গাদ্দারী হবে। ফোনটা হাতে নিয়ে—হ্যালো, দোস্ট! বিকেল পাঁচটায় তুই রমনা  পার্কে আসিস। অনেক কথা আছে। গুরুত্বপূর্ণ অনেক কিছু। সাথে তোর জন্য রয়েছে একটি অপূর্ব সারপ্রাইজ। তবে শোন, আমি যেখানে বসে থাকব, তুই সেখান থেকে কিছুটা নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করবি। দৃশ্যগুলো শুধু অবলোকন করবি। কাছে আসিসনে। এ ব্যাপারে পরে তোকে সব খুলে বলব।

রাহাত আজ নিজেকে সাজাতে ব্যস্ত। কী পড়বে? কোনটা পড়বে? প্রেয়সীর জন্য নিজেকে কেমন করে সাজাবে? কোন পোষাকে তাকে খুব স্মার্ট দেখাবে? নিজেকে কী ভাবে সেখানে উপস্থাপন করবে? এসব ভেবে সকাল গড়িয়ে দুপুর। দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল হয়ে গেল। কিছু ভেবে না পেয়ে রাহাত তাঁর বোনকে ডাকল। বলল, এই দেখতো, আমাকে কোন পোষাকটায় বেশি মানায়? শেষ পর্যন্ত ভাই-বোন মিলে পোষাক নির্বাচন করল। তারপর কাচু মাচু করে বোনকে আবার বলল, বোন আমার! তুই যদি কিছু মনে না করিস তাহলে কাছে একটি আবদার করব। বল রাখছি তো?

বলো। রাখার চেষ্টা করবো।

তোর গলার চেইন আর আংটিটা দে তো! একটু ঘুরে আসি। বেশিক্ষণ বাইরে থাকব না। যাব আর আসব।

ছোট বোন রোমানার কিছুই বলার ছিল না। বড় ভাই চাওয়ামাত্র চেইন ও আংটি এনে হাজির করল। রাহাত ঘড়ির দিকে তাকাল। হায় হায়, তৈরি হতেই চারটা! না, আর এক মুহুর্তও দেরি করা চলবে না। রোমানা! আসিরে। বড় দেরী হয়ে গেছে। হাতে সময় নেই। এই বলে রাহাত দিল এক ছুট।

পাঁচটা বাজতে এখনো পনের মিনিট বাকি। রাহাত নির্ধারিত স্থানে  পৌঁছে গেল। কিন্তু যেখানে সাক্ষাতের কথা ছিল সে স্থানটি আগেই অন্যদের দখলে চলে যাওয়ায় রাহাতের মনটা খারাপ হয়ে গেল। তাই বিষন্ন মনে পাশেই পায়চারী করতে লাগল সে।

খানিক পর লাভলি এল। সে রাহাতকে কিছুটা অনুমান করে কাছে এসে পিছন থেকে দু’বার মিসকল দিয়ে নিশ্চিত হলো যে, এ-ই রাহাত।

রাহাত এখনো লাভলীকে দেখতে পায় নি। সে আগের মতোই পায়চারী করছে। হঠাৎ সে পেছনে দিক থেকে দুটো নরম হাতের ছোঁয়া পেল। সঙ্গে সঙ্গে আৎকে উঠে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতেই লাভলি এক গাল হেসে বলল, আমার অনুমান  মিথ্যে না হলে তুমি নিশ্চয় মিঃ রাহাত।

রাহাত বলল, ঠিকই বলেছ। আর আমি রাহাত হলে তুমি নিশ্চয় লাভলী।

হ্যাঁ, তোমার অনুমানও মিথ্যে নয়। এ বলে রাহাতকে সাথে নিয়ে লাভলী একটি নির্জন স্থানে গিয়ে বসল।

রাহাত একজন মুসলমান। ইসলাম তাকে এ ব্যাপারে কী বলেছে তা সে ভালো করেই জানে। সে জানে যে—পরনারীকে দেখা, তাঁর সাথে এভাবে সামনাসামনি বসা, কথাবার্তা বলা, প্রেমালাপ করা ইত্যাদি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও হারাম। কিন্তু শয়তানের প্ররোচনায় আজ যেন সে সবকিছু ভুলে গেছে। ভুলে গেছে এই জঘন্য অপরাধের মর্মন্তুদ শাস্তির কথা।

লাভলীর সাথে রাহাতের আজ প্রথম দেখা। তাই সে প্রথম প্রথম একটু লজ্জাবোধ হলেও দীর্ঘক্ষণ আলাপ-আলোচনার পর ওদের মাঝে এক নববন্ধন সৃষ্টি হলো। ফলে কথা বলতে বলতে কখন যে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল এবং গোটা পার্ক জনশূন্য হয়ে পড়ল, তা তারা টেরও পেল না।

ওদিকে শরীফ যখন দেখল, রাহাত একটি মেয়ের সাথে দীর্ঘক্ষণ যাবত কথা বলছে, ফেরার কোনো নামগন্ধ নেই, এমনকি তাঁর দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না, তখন সে অস্থির হয়ে মনে মনে রাহাতকে গালমন্দ করতে লাগল। সেই সাথে বলল, রাহাত! এটাই কি তোর সারপ্রাইজ যে, আমি দীর্ঘ দুটি ঘন্টা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে যাচ্ছি! আর তুই কোথাকার এক মেয়েকে নিয়ে আনন্দে মেতে আছিস? ঠিক আছে, আজ বাড়িয়ে আয়। আমিও তোকাএ সারপ্রাইজ দেব। এ বলে সে রাগে গদগদ করতে করতে বাসায় চলে এল।

রাহাত কিছু বলতে যাবে ঠিক এমন সময় একটি লোক দৈত্যের মতো তাদের সামনে হঠাৎ আবির্ভূত হল। অদূরে দেখা গেল, আরো কয়েকজন লোক। লোকগুলো যে তারই, এ ব্যাপারে রাহাতের কোনো সন্দেহ রইল না।

লোকটি বক্র হাসি হেসে বলল, কী দুলা মিয়া! মধুর প্রেমালাপ কি শেষ হয়েছে? হয়ে থাকলে দেরী না করে ঝটপট ট্যাক্সটা পরিশোধ করে ফেলুন!

লোকটির কথায় রাহাত যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে মনে মনে বলল, প্রেমিকার সাথে কথা বললে ট্যাক্স দিতে হয়, তা তো আগে জানতাম না!

রাহাত এবার লাভলীর দিকে তাকাল। সে দেখল, লাভলীর চেহারায় দুষ্টুমীর হাসি। এ দৃশ্য দেখে তাঁর অন্তরটা ছ্যাৎ করে উঠল। এমনকি খানিক বাদে তাঁর সামনে একথা পরিস্কার হয়ে গেল যে, লাভলী মূলত তাঁর প্রেমিকা নয়, সে আসলে আধুনিক ছিনতাইকারী দলের একজন সক্রিয় সদস্য। আগত লোকগুলো তারই সঙ্গি-সাথী।

লোকটি রাহাতের গলা থেকে স্বর্ণের চেইন, হাতের আংটি, মোবাইল ও ঘড়িসহ টাকা-পয়সা যা ছিল সব হাতিয়ে নিল। ইতোমধ্যে তাঁর অন্যান্য সাথীরাও সেখানে এসে হাজির হলো।

সবকিছু ছিনিয়ে নেওয়ার পর এখন চলে যাওয়ার পালা। সবাই ধীর পায়ে সেখানে থেকে চলে আস্তে লাগল। এমন সময় ছিনতাইকারীদের একজন বলে উঠল, আরে! দোস্তের শার্টাটা তো বেশ সুন্দর দেখছি! এ বলে সে রাহাতের দেহ থেকে শার্টটাও খুলে নিল। এমন সময় আরেকজন বলল, প্যান্টটাও খুলে নাও। বস বলল, থাক। দুলা মিয়াকে এতটা অপমান করা ঠিক হবে না। চল এখন যাই। এ বলে রাহাতের দিকে মুখ করে বলল, দোস্ত আজ তাহলে বিদায়। আরেকদিন দেখা হবে। আজকের চেয়ে আরো ভালো প্রস্তুতি নিয়ে মাঝে মধ্যে এখানে এসো। কেমন?

এতক্ষণ লাভলী হাস্যোজ্জ্বল চেহারা নিয়ে ওদের কাণ্ডকীর্তি দেখছিল। সবশেষে ছিনতাইকারীরা যখন চলে যেতে লাগল, তখন সেও তাদের সাথে রওয়ানা দিল। তবে যাওয়ার আগে ঠোঁট দু’টি বাঁকা করে রাহাতের দিকে তাকিয়ে একটি ভ্যাংচি কাটল। সেই সাথে ফেটে পড়ল অট্টহাসিতে। আর বলল, গুড বাই! থ্যাংক ইউ! সুখে থেক বন্ধু। আবার কথা হবে। বাই!

প্রিয় পাঠক! এই হলো  বর্তমান মোবাইল ফোনের বেশকিছু খারাপ দিকের একটি। মোবাইল ফোনের কারণে কত যুবক-যুবতি যে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, কত মানুষ জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন প্রকার পাপে, তাঁর কোনো ইয়ত্তা নেই। আল্লাহ পাক আমাদের হেফাজত করুন। আমীন।

লেখকঃ মাওলানা মুহাম্মদ মুফীজুল ইসলাম। বইঃ আদর্শ যুবক যুবতি ১ থেকে। 


Read More...